মেলবোর্ন,২ জুলাই- ভয়াবহ দুই দফা ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৯৫ জনে। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ এবং এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ক্রমবর্ধমান প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে দেশের ‘আত্মা ক্ষতবিক্ষত’ হয়ে গেছে। নিহতদের স্মরণে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী কারাকাসের উত্তরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা শহরের অধিকাংশ ধসে পড়া ভবনে ইতোমধ্যে ‘ডি (ডিসিস্ট)’ চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, ওই ভবনগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকারী দলগুলোর ভাষ্য, এক সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ায় জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা এখন খুবই ক্ষীণ।
স্পেনের একটি উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোদেস বলেন, যেখানে জীবিত মানুষের অস্তিত্বের কোনো সম্ভাবনা নেই, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর দিয়েও ধ্বংসস্তূপে জীবনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে হতাশার মধ্যেও এক অলৌকিক ঘটনা দেশবাসীকে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এত দীর্ঘ সময় পর জীবিত উদ্ধার অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এই দুর্যোগে অন্তত ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। বহু পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে তেলসমৃদ্ধ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই বিপর্যয়ে আরও ভেঙে পড়েছে।
দুর্গত এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় সংকট খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির। ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন হাজারো মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় খাবার সংগ্রহকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সরকারি সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
লা গুয়াইরার বাসিন্দা দানিয়েলা আরমাস বলেন, ত্রাণ এলেও তা সবার জন্য যথেষ্ট নয়। খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষ প্রায় মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ভেনেজুয়েলা প্রধান লিয়া পোজ্জিও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন উল্লেখ করে বলেন, দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা না বাড়ালে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগামী তিন মাসে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের কাছে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিতে ৫ কোটি ডলার জরুরি তহবিল চেয়েছে। একই সময়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা আগামী ছয় মাসে ৩০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি আশ্রয় ও সহায়তা নিশ্চিত করতে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের আবেদন জানিয়েছে।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম চাপে থাকায় হাম, ডিপথেরিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও চিকিৎসাসেবার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
এদিকে হাজারো পরিবার এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফিরছে। লা গুয়াইরার বাসিন্দা হেলেন গুয়েদেজ বলেন, তার বাবা, বোন ও দাদি এখনও নিখোঁজ। তিনি বলেন, ‘আমরা খোঁজ চালিয়ে যাব। জীবিত না পেলেও অন্তত তাদের মরদেহ উদ্ধার করে সম্মানের সঙ্গে দাফন করতে চাই।’
সূত্র: ফ্রান্স২৪