শুভেচ্ছার বার্তা নিয়ে ভারত গেল বাংলাদেশের ১,১০০ কেজি আম
মেলবোর্ন,১ জুলাই- বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে ১ হাজার ১০০ কেজি আম…
মেলবোর্ন, ২২ সেপ্টেম্বর– বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্তবর্তী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কারণে নতুন এক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে ভারত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখলেও বর্তমানে তাদের পদক্ষেপগুলো আরও কঠোর, এমনকি শাস্তিমূলক বলে মনে হচ্ছে। ঢাকা’র রাজনৈতিক পরিবর্তনে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে দিল্লি—যা তারা হঠাৎ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, প্রকাশ্য প্রদর্শন এবং বাড়তি কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে দেখিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আবির্ভাবে ভারত অসন্তুষ্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। দীর্ঘদিনের সমর্থিত সরকারের পরিবর্তে এখন দিল্লির সামনে রয়েছে এক অনিশ্চিত প্রতিপক্ষ। সীমান্তে চাপ, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং বাণিজ্য প্রতিশোধ এখন যেন প্রতিরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়।
৭ মে থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ১,৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে—যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাও ছিল। আন্তর্জাতিক নিয়মবিরোধী এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিক পরিবর্তনের দুর্বল সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এতে জনঅসন্তোষ ও অস্থিরতাও বেড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনেকের মতে, এটি ভারতের আঞ্চলিক কৌশলের এক বিস্তৃত প্যাটার্নের অংশ, যেখানে রাজনৈতিক বার্তা কৌশলগত চাপের মাধ্যমে ছড়ানো হয়।
এদিকে ভারতের অবকাঠামোগত আগ্রাসী সম্প্রসারণ বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। গত এক দশকে ভারত কার্যকরভাবে বাংলাদেশকে নদী, রেল ও সড়কের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে, যা উত্তর–পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করেছে। মিয়ানমারের কালাদান মাল্টি-মডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তৈরি করিডরের কারণে ভারতের লজিস্টিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ড. ইউনূসের বক্তব্য— “বাংলাদেশই তাদের সমুদ্রপথের একমাত্র রাস্তা”— ভারতের কাছে কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ উত্তর–পূর্ব ভারতের প্রদেশগুলো স্থলবেষ্টিত (landlocked)। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত মূল স্থানে সামরিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছে এবং ত্রিপুরার কৈলাসহর বিমানঘাঁটি পুনরায় সক্রিয় করেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্তেও দিল্লি অস্বস্তি বোধ করছে, কারণ এটি শিলিগুড়ি করিডরের কাছে অবস্থিত।
ভারতের হঠাৎ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের রপ্তানি নেটওয়ার্কে আঘাত করেছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, পোশাক ও গৃহস্থালি পণ্যের অর্ডার বিলম্বিত হচ্ছে, চালান বন্ধ হয়ে পড়ছে—যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা, যাদের বাজার মূলত ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চল। এ পদক্ষেপকে অনেকে ভারতের সুতো (yarn) আমদানিতে বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কম, বিপরীতে আমদানি করেছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য বৈষম্য মারাত্মকভাবে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর–পূর্ব ভারতে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও এখন ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির শিকার।
বিদ্যুতও বাংলাদেশের জন্য এক দুর্বলতা। দেশের মোট সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ বা ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে। এ খাতে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে বাংলাদেশের নগর ও শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভারতের বর্তমান অবস্থান মূল্যায়ন করতে গেলে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিকেও বিবেচনায় নিতে হয়। ছোট ম্যান্ডেট নিয়ে মোদি সরকারের ক্ষমতায় ফেরা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা—এসব কারণে দিল্লি এখন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা ভারতকে আরও চিন্তিত করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডর চালু এবং তিন দেশের অবকাঠামোগত সহযোগিতা বিষয়ক প্রাথমিক আলোচনাকে দিল্লি উদ্বেগের চোখে দেখছে। এতে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত কেন্দ্রস্থল ভারতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে সরে গিয়ে নতুন ভারসাম্য পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
‘নিউ বাংলাদেশ’ শব্দবন্ধটি প্রথমে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ভারতীয় বিশ্লেষকরা এখন এটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের প্রভাব প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন। এর ফলে কূটনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ব্যাক-চ্যানেল যোগাযোগ দুর্বল হয়েছে এবং উচ্চ পর্যায়ের সফরও কমেছে। ঢাকা বারবার পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতা চাইছে, কিন্তু ভারত সাড়া দিতে অনাগ্রহী।
তবু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয় ও জটিল। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের একমাত্র প্রবেশদ্বার, আর ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে সম্পর্কটি ভারসাম্যহীন। ভারতীয় জ্বালানি, বাণিজ্য ও পরিবহনের ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ ও ভারত কি সাময়িক সমাধান এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারবে? বর্তমান উত্তেজনা এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাকে সামনে এনেছে।
সমস্যা সমাধানে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে সংলাপ। বাংলাদেশকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্ত ও বাণিজ্য সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত কাঠামো জরুরি। পাল্টা ব্যবস্থা বা প্রতিশোধ কোনো কার্যকর সমাধান নয়।
একইসঙ্গে ঢাকা’কে কূটনৈতিক, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক বিকল্প বাড়াতে হবে। আসিয়ান, সাফটা ও বিমসটেক ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে কোনো একটি দেশ নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে হুমকি হিসেবে না দেখে মেনে নেওয়াই ভারতের জন্য সর্বোত্তম পদক্ষেপ হবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও চুক্তির বাইরেও রয়েছে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, নদী ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে এখন উভয় পক্ষের পরিপক্বতা দরকার।
বর্তমান পরিস্থিতি কৌশল, প্রজ্ঞা ও কূটনীতির বড় পরীক্ষা। ঢাকা ও দিল্লির সিদ্ধান্ত কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করবে।
প্ররোচনামূলক ভাষার বদলে চলুন—সহযোগিতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন অধ্যায় রচনা করি।
সুত্রঃ ডন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au