মানুষের মস্তিষ্কের প্রতীকী ছবি। ছবি: বিবিসি
মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- ভয় মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি। প্রতিকূল পরিবেশ চিহ্নিত করে বিপদ এড়াতে ভয় কাজ করে প্রতিরক্ষামূলক ঢালের মতো। কিন্তু পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আছেন, যাদের এই অনুভূতি নেই। তাঁরা এমন এক বিরল রোগে ভোগেন, যার কারণে আকাশ থেকে লাফ দেওয়া বা সাপ–মাকড়সার সামনে দাঁড়িয়েও কোনো আতঙ্ক বোধ করেন না। এই রোগের নাম উরবাখ–উইথে (Urbach–Wiethe) বা লিপোইড প্রোটেইনোসিস।
যুক্তরাজ্যের নাগরিক জর্ডি সারনিক প্রথমে কাশিং সিনড্রোমে ভুগছিলেন। উদ্বেগ কমাতে তাঁর অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি অপসারণ করা হয়। এতে উদ্বেগ কমলেও, পরবর্তী সময়ে দেখা দেয় এক নতুন সমস্যা—ভয় একেবারেই অনুভব করেন না তিনি।
২০১২ সালে ডিজনিল্যান্ডের রোলারকোস্টার,উড়োজাহাজ থেকে স্কাইডাইভিং,নিউক্যাসলের ব্রিজ থেকে জিপলাইন,লন্ডনের আকাশচুম্বী ভবন থেকে দড়ি বেয়ে নামা,
এসব চরম ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতার সময়ও তাঁর হৃদস্পন্দন বাড়েনি, শরীরে অ্যাড্রেনালিন কাজ করেনি।
এই রোগ এতটাই বিরল যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত ‘এসএম’ নামে এক নারী বিশেষভাবে আলোচিত।
এসএম-কে ভয় দেখানোর জন্য বিজ্ঞানীরা ভয়ঙ্কর সিনেমা, ভূতুড়ে ঘর, সাপ–মাকড়সা পর্যন্ত ব্যবহার করেছিলেন। তবুও কোনো পরিস্থিতিতে তিনি ভয় পাননি।
রোগের বৈজ্ঞানিক কারণ
- কারণ: ক্রোমোসোম–১–এ থাকা ইসিএম১ (ECM1) জিনে মিউটেশন
- প্রভাব: ইসিএম১ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্যালসিয়াম ও কোলাজেন জমা হয়, কোষ নষ্ট হয়
- সবচেয়ে ঝুঁকিতে: মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা, যা ভয়ের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে
এসএম-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অ্যামিগডালা প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ভয়ের অনুভূতি বিলীন হয়ে গেছে। তবে সুখ, রাগ বা দুঃখের মতো অন্যান্য আবেগ ঠিকই অনুভব করতে পারেন।
গবেষক জাস্টিন ফেইনস্টাইন বলেন, ভয় না থাকাটা যেমন মনে হয় আশীর্বাদ, বাস্তবে তা জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। প্রাণিজগতে ভয় না থাকলে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যদি কোনো প্রাণীর অ্যামিগডালা নষ্ট করে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া হয়, কয়েক ঘণ্টা বা দিনের মধ্যেই সে মারা যাবে।”
উরবাখ–উইথে রোগীদের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভয় শুধু মানসিক দুর্বলতা নয়, বরং টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। তবু এসএম-এর মতো কিছু মানুষ অ্যামিগডালা ছাড়া দীর্ঘদিন বেঁচে আছেন, যা মানবমস্তিষ্কের জটিলতা ও অভিযোজনক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ।
সুত্রঃ বিবিসি