মেলবোর্ন, ২ অক্টোবর: প্রতি বছর ১লা অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব নিরামিষ দিবস। এবছর এই দিনটির প্রতিবাদ্য বিষয় হলো, “জানুন কেন সবুজ খাদ্যাভ্যাস আপনার শরীরের জন্য গেম-চেঞ্জার?”
এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় উদ্ভিদভিত্তিক জীবনধারার নানা স্বাস্থ্য উপকারিতা। সঠিকভাবে অনুসরণ করলে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস হৃদপিণ্ডের সুস্থতা থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমানো পর্যন্ত নানাভাবে উপকারে আসে। নিরামিষ জীবনধারা বেছে নেওয়া শুধু একটি সাময়িক প্রবণতা নয়, বরং এটি শরীর ও হৃদয়ের জন্য উপকারী এক জীবনধারা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে নিরামিষভোজীরা অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকিতে তুলনামূলকভাবে কম ভোগেন, বিশেষ করে কিছু প্রকারের ক্যানসার। উদাহরণস্বরূপ, উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস কোলন ক্যানসার, পাকস্থলীর ক্যানসারসহ আরও অনেক জটিল রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
সাধারণ প্রশ্ন, নিরামিষ কেন খাব? মাছ-মাংস থেকে পাওয়া প্রয়োজনীয় ভিটামিন বা সুষম খাদ্যের ঘাটতি নিরামিষ খাবার খেয়ে কিভাবে পূরণ হবে? নিরামিষ ভোজীদের এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে খুবই স্বাভাবিক। এই লেখার মাধ্যমে এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এই লেখায় বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক এবং শাস্ত্রীক তথ্য উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে। নিরামিষ খাবারের পক্ষে যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে প্রয়োজনীয় তথ্য বিভিন্ন ডাটাবেজ যেমন গুগল স্কলার-এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
শাক-সবজি থেকে আসা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বা মাছ-মাংস থেকে আসা প্রাণীজ প্রোটিন, কোনটি মানব শরীরের জন্য বেশি উপকারী?
অ্যাকাডেমি অফ নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটিক্সের সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য মতে, নিরামিষ আহারে হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি কমায়। নিরামিষ ভোজীদের টাইপ 2 ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এমন কি ক্যান্সারেরও ঝুঁকি কম থাকে। আমিষ ভোজীদের তুলনায় নিরামিষ ভোজীদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ কম।
৩০ হাজার মহিলার ওপর ১৫ বছর ধরে চলা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা আমিষ গ্রহণ করেন তাদের তুলনায় নিরামিষ আহারিগণ কম হৃদরোগে আক্রান্ত হন। কারণ, মাছ-মাংসে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট থাকে। অতিরিক্ত ক্যালোরি মানুষের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। এর ফলে, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের মতোও মরণব্যাধি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতি ১০০ গ্রাম মাংস গ্রহণে শরীর থেকে মল আকারে বের হতে বেশ কয়েকদিন লেগে যায়। এর ফলে শরীরে মাংস পচে বিষক্রিয়া তৈরি হতে পারে। পরবর্তীতে ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগের জন্মানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রাণিজ আমিষ খাবার গ্রহণের ফলে মানুষের ত্বক তৈলাক্ত হয়ে যায়। মাছ, মাংস, ডিম কোলেস্টেরল বাড়ায়। এসব খাবার শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে।
২০১৯ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিরামিষ আহার করেন তারা আমিষ ভোজীদের তুলনায় খুব কম টাকা চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেন।
নিরামিষ এবং সেক্স?
গবেষণায় দেখা যায় নিরামিষ ভোজীদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। কেননা, নিরামিষ ‘সেক্স’-এর জন্য বেশ কার্যকর। নিরামিষ খাবারে পৌরুষত্বহীনতার সমস্যা দেখা যায় না। আমিষ জাতীয় খাবার খেলে শরীরে ‘টক্সিক’ উপাদান ঢোকে। ফলে শরীর থেকে অ্যামোনিয়ার কটু গন্ধ বেরোয়। কিন্তু, নিরামিষভোজী হলে এমন সমস্যা নেই। রোমাঞ্চের সময় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালে ইউনাইটেড কিংডম এর বৃহত্তম ডেটিং সাইটের ১ গবেষণায় দেখা গেছে নিরামিষাশীরা আমিষ ভোজীদের তুলনায় বেশি বার যৌন মিলন করার সক্ষমতা রাখেন। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিরামিষভোজী, তাদের খাদ্য তালিকায় ফলমূল বেশি থাকে। ফল শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। নিরামিষ জাতীয় খাবারে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ, যা শরীর ও মনকে সুস্থ রাখে।
সাত্ত্বিক আহার বনাম রাজসিক আহার
এবার শাস্ত্রীক সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আসা যাক। গীতায় বলা আছে, “যে আহার আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ ও প্রীতি বর্ধনকারী এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী ও মনোরম, সেগুলো সাত্ত্বিক আহার হিসেবে সর্বদা বিবেচ্য হয়ে থাকে” (গীতা ১৭/৮)
অর্থাৎ, যা আহারে তৃপ্তি অনুভব করি এবং যে তৃপ্তি শরীরের জন্য ক্ষতিকারক নয়। যে আহার সর্বদা উত্তম হিসেবে বিবেচ্য এবং ধর্ম পথ ও ধর্ম কার্য এবং স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে সর্বদা সাহায্য করে তাই সাত্ত্বিক আহার।
পক্ষান্তরে যে আহার অতি তিক্ত, অতি অম্ল, অতি লবনাক্ত, অতি উষ্ণ, অতি তীক্ষ্ণ, অতি শুষ্ক, অতি প্রদাহকর এবং দুঃখ, শোক ও রোগপ্রদ সেগুলো রাজসিক আহার হিসেবে বিবেচ্য” (গীতা ১৭/৯)
রাজসিক আহারের মধ্যে যেমন মাংস, টক, ঝাল, রসালো, শক্ত ইত্যাদি খাবার গ্রহণের ফলে আমাদের দেহ ও মনে সহজেই বিশাল প্রভাব পড়ে। এইসব আহারে লোভ, কাম, ক্রোধ, ব্যাথা, যন্ত্রনা অনুভব হয়, যা আমাদের শরীরের জন্য হীতকর নয়। এইসব আহার সর্বদা উত্তম হিসেবে বিবেচ্য হয়না এবং স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে সর্বদা সাহায্য করেনা।
গীতার এই দুটি সারসংক্ষেপ থেকেই পরিষ্কারভাবে অনুমান করা যায় সাত্ত্বিক আহার মানব শরীর ও মনের জন্য ভালো নাকি রাজসিক আহার?
নিরামিষ এবং পরিবেশগত প্রভাব
নিরামিষ আহার গ্রহণের জন্য সবচেয়ে বড় যৌক্তিক দিকগুলোর মধ্যে একটি হল এর গভীর পরিবেশগত সুবিধা। গবাদি পশু, শিল্প, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, বন উজাড় এবং জল দূষণের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে নিরামিষ আহার বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রাণী-ভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম জমি, জল এবং শক্তি প্রয়োজন। জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে খাদ্য হিসেবে পশুসম্পদের উৎপাদন শিল্প পরিবেশের ওপর বেশ বড় মাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার প্রায় ১৮ শতাংশ আসছে এই খাত থেকে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক কেজি সবজি ফলাতে ৩০০ লিটারের কিছু বেশি পানির প্রয়োজন হয়, এক কেজি গরুর মাংস উৎপাদনে পানির প্রয়োজন ১৫ হাজার লিটারের বেশি। এক কেজি মুরগির মাংস উৎপাদনে লেগে যায় ৪ হাজার লিটারের বেশি পানি। এমনভাবেই আমাদের পশুভিত্তিক খাদ্যের চাহিদাগুলো আমাদের সম্পদ এবং পরিবেশের ওপর অনেক বড় চাপের কারণ হয়ে থাকছে।
নিরামিষ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নৈতিকতা
মনোবিশেষজ্ঞের মতে, যারা নিরামিষ খান, তারা সাধারণত পশুপ্রেমী হন। নিরামিষ ভোজীদের মন সুন্দর হয়। ফল আর শাকসবজি মানুষের শরীর থেকে ‘সেরোটোনি’ হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে, মন খুশিতে ভরপুর থাকে।
মাংস বনাম উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, মাছ-মাংস থেকে পাওয়া প্রয়োজনীয় ভিটামিন বা সুষম খাদ্যের ঘাটতি নিরামিষ খাবার খেয়ে কিভাবে পূরণ হবে? চলুন দেখে নিই মাংস বনাম উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের গুনাগুন।
গ্রাউন্ড বিফ: 3 oz = 22 গ্রাম প্রোটিন
কালো মটরশুটি: 1.5 কাপ = 22.5 গ্রাম প্রোটিন
গরুর মাংস যাতে সর্বাধিক প্রোটিন রয়েছে তার সাথে মটরশুঁটির তুলনা করলে দেখা যায় পরিবেশগত এবং পুষ্টির দিক থেকে মটরশুঁটি অনেক এগিয়ে আছে।
স্টেক বনাম কাজু বাদাম
স্টেক: 4 oz = 40 গ্রাম প্রোটিন
কাজু বাদাম: 1 কাপ = 40 গ্রাম প্রোটিন
এক কাপ কাজুবাদামে 4 oz স্টেকের সমান পরিমাণ প্রোটিন থাকতে পারে। কিন্তু এটা সত্য. শুধু তাই নয়, কাজু বাদাম পুষ্টির মূল্যের একটি অতিরিক্ত উপাদান দেয় যার মধ্যে 83 মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, 168 মিলিগ্রাম ফসফরাস এবং 187 মিলিগ্রাম পটাসিয়াম প্রতি আউন্স এ থাকে।
চিকেন ব্রেস্ট বনাম মসুর ডাল
মুরগির ব্রেস্ট : 3 oz ব্রেস্ট = 26 গ্রাম প্রোটিন
মসুর ডাল: 1.5 কাপ = 27 গ্রাম প্রোটিন
মাত্র 1.5 কাপ মসুর ডালে 3 আউজ মুরগির ব্রেস্টের সমান প্রোটিন থাকে, তবে মসুর ডালে ডায়েটারি ফাইবার, তামা, ফসফরাস এবং ম্যাঙ্গানিজ থাকে যা মুরগির মাংস থেকে পাওয়া সম্ভব নয় ।
সালমন মাছ বনাম পিনার্ট বাদাম
সালমন: 4 oz = 23 গ্রাম প্রোটিন
চিনাবাদাম মাখন: ½ কাপ = 32 গ্রাম প্রোটিন
সালমন মাছ এবং চিনাবাদাম উভয় উৎসতেই ওমেগা -6 ফ্যাটি অ্যাসিড এবং পটাসিয়াম বেশি থাকে। বাদামকে সুপারফুড বলা হয়। বাদামে ৩.৭ মিলিগ্রাম লোহা, ১২ গ্রাম তত্ত্ব, ২৬৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।
এক বাটি বাদাম এক বাটি মুরগি বা খাসির মাংসের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর। তেমনি ভাবে মুরগি বা গরুর মাংসের তুলনায় কুমড়া বীজের পুষ্টি অনেক বেশি। ১ কাপ কুমড়া বীজে ১৮ গ্রাম তন্ত রয়েছে যা কিনা এক টুকরো মুরগির মাংসেও নেই। নিরামিষভোজীরা কুমড়ার নানা রেসিপি তৈরি করতে পারেন।
উপরের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকেই বুঝা যায় যে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন আমরা সহজেই কিভাবে ভেজিটেরিয়ান বা নিরামিষ খাবারের মধ্যেই পেয়ে থাকি।
বিশ্ব নিরামিষ দিবস ২০২৫: জানুন কেন সবুজ খাদ্যাভ্যাস আপনার শরীরের জন্য গেম-চেঞ্জার
সবুজ খাদ্যাভ্যাস শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, পরিবেশ ও পৃথিবীর জন্যও কল্যাণকর। এটি নতুন নতুন নিরামিষ খাবার চেষ্টা করার, স্বাদের বৈচিত্র্য আবিষ্কার করার এবং নিজের শরীর ও মন কতটা সুস্থ ও সতেজ থাকতে পারে তা উপলব্ধি করার এক দুর্দান্ত সুযোগ। এ দিনটি নিরামিষভোজনের স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত সুফলকে তুলে ধরে এবং মানুষকে নিরামিষ জীবনধারা গ্রহণে উৎসাহিত করে। ১৯৭৭ সালে উত্তর আমেরিকান ভেজিটেরিয়ান সোসাইটি এই দিবসের সূচনা করে। এটি এখন বিশ্বব্যাপী নিরামিষ চর্চার সচেতনতা বৃদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নিরামিষ বা শাক সবজি জাতীয় খাদ্যের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন এবং উৎসাহিত করতে বিশ্বের বহু দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। নিরামিষ খাবার নিয়ে দিন দিন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, চর্চা বাড়ছে, বিজ্ঞান নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছে। পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদের সকলের। বাঁচিয়ে রাখার মানুষের এই প্রচেষ্টায় আপনিও যোগ হতে পারেন নিরামিষ বা শাকসবজি এবং ফলমূল জাতীয় খাবার গ্রহণের মাধ্যমে। আপনার, আমার, আমাদের সকলের অতি ক্ষুদ্র অবদান অথচ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁচাতে দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ আর কি হতে পারে?
প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন