শিক্ষা

গবেষণার জন্য দানের মরদেহ চুরির ঘটনায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে: আদালত

  • 5:15 pm - October 07, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৪৪ বার
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: রয়টার্স

মেলবোর্ন, ৭ অক্টোবর- মরদেহ চুরির ভয়াবহ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত সোমবার রায় দিয়েছেন যে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় “দানের মরদেহ চুরি ও বিক্রির ঘটনায় প্রশাসনিক অবহেলা” করেছে এবং তাই প্রতিষ্ঠানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারে দাঁড়াতে হবে।

এই মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক জগতে গভীর আলোড়ন তুলেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় যে, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মর্গের ম্যানেজার সেড্রিক লজ (Cedric Lodge) দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত দানকৃত মরদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরি করে বিক্রি করছিলেন।
এই মরদেহগুলো ছিল এমন ব্যক্তিদের, যারা মৃত্যুর পর নিজের দেহ গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেছিলেন।

তদন্তে দেখা যায়, লজ শুধু নিজেই এসব দেহাংশ বিক্রি করেননি, বরং তার স্ত্রী ডেনিস লজ ও কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে একটি অবৈধ অঙ্গব্যবসার চক্র গড়ে তুলেছিলেন। তারা বিভিন্ন অঙ্গ ও হাড় অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি করতেন।

আদালতে দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, লজ ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের “Anatomy Gifts Program”–এ সংরক্ষিত শতাধিক মরদেহ থেকে অঙ্গ কেটে নিয়ে বিক্রি করেছেন।
প্রতিটি অঙ্গ বা কঙ্কালের অংশ শত থেকে কয়েক হাজার ডলার মূল্যে বিক্রি করা হতো।

তদন্তকারীরা জানান, লজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্গে কাজের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কখনও কখনও “পূর্ব অনুমতি ছাড়া” বাইরের লোকদের মর্গে ঢুকতে দিতেন এবং তারা নিজেরাই পছন্দমতো অঙ্গ বেছে নিতেন।

এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটররা ২০২৪ সালে লজ দম্পতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।

ম্যাসাচুসেটসের বিচারক রবার্ট ডেভিস সোমবার বলেন, “হার্ভার্ড প্রশাসন দায়িত্বে অবহেলা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি অপরাধচক্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সক্রিয় ছিল, অথচ কর্তৃপক্ষ তা জানত না— এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।”

আদালত আরও বলেন, হার্ভার্ডের প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে মৃতদেহ দানকারীদের পরিবারকে চরম মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে।

বিচারক তাই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন— বিশ্ববিদ্যালয় দাতাদের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা দেওয়ানি মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হবে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র জেসন নিউম্যান এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। এটি আমাদের মূল্যবোধের পরিপন্থী একটি ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরোপুরি সহযোগিতা করছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নতুন নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।”

তবে হার্ভার্ড দাবি করেছে যে, প্রশাসন “ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, বরং তদারকির ঘাটতির কারণে” এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যেই নিহতদের পরিবারের জন্য দুঃখ প্রকাশ ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট নন।
একজন নিহত দাতার মেয়ে র‍্যাচেল হিউজ সাংবাদিকদের বলেন,

“আমার বাবা বিশ্বাস করেছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর দেহ বিজ্ঞান গবেষণায় কাজে লাগবে। কিন্তু হার্ভার্ড সেটিকে পণ্যে পরিণত করেছে। আমরা এই বিশ্বাসঘাতকতার বিচার চাই।”

আরেকজন পরিবারের সদস্য বলেন,

“এই ঘটনা শুধু আইন নয়, মানবতারও লঙ্ঘন। হার্ভার্ড তার নৈতিক দায় থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।”

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার জন্য দান করা মরদেহ ব্যবহারের নৈতিক মানদণ্ডে নতুন নজির তৈরি করবে।
হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে যদি আদালত কঠোর রায় দেয়, তাহলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়কেও মরদেহ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কড়া নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে হার্ভার্ডের সাবেক নীতিবিজ্ঞান অধ্যাপক ড. মাইকেল সেন্ডেল বলেন,

“মানুষ যখন নিজের দেহ দান করে, তখন সেটি একটি পবিত্র আস্থা। সেই আস্থা ভঙ্গ মানে কেবল অপরাধ নয়, এটি মানবিকতার অবমাননা।”

হার্ভার্ড প্রশাসন এখন একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
তারা দেখছে— এই ঘটনায় অন্য কোনো কর্মকর্তা বা অধ্যাপক যুক্ত ছিলেন কি না;তদারকি ব্যবস্থায় কী ধরনের দুর্বলতা ছিল;ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও নৈতিক মানদণ্ড কীভাবে শক্তিশালী করা যায়।

তদন্ত শেষ হলে এর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে দায় প্রমাণিত হলে—

দাতাদের পরিবারের জন্য কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ,প্রশাসনিক প্রধানদের বিরুদ্ধে অবহেলার মামলা,এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার লাইসেন্স স্থগিত করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

বিচার কার্যক্রম আগামী নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

হার্ভার্ডের মরদেহ চুরির এই কেলেঙ্কারি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামই নষ্ট করেনি, বরং বিজ্ঞান ও মানবতার প্রতি আস্থাকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই— বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই তার নৈতিক দায় স্বীকার করবে, নাকি আইনি জটিলতায় বিষয়টি ধামাচাপা পড়বে?

বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার রায় যুক্তরাষ্ট্রে “বৈজ্ঞানিক গবেষণা বনাম মানব মর্যাদা” বিতর্কে এক নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।

সুত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগে হিন্দু যুবক গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে শ্যামল গাইন (২০) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার…

মুম্বাইয়ে সালমানের সঙ্গে নয়নতারার মিশন শুরু

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- বলিউডে নতুন চমক নিয়ে হাজির হচ্ছেন দুই ভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় তারকা-সালমান খান ও দক্ষিণ ভারতের ‘লেডি সুপারস্টার’ নয়নতারা। মুম্বাইয়ে শুরু হয়েছে তাদের…

শিশুসহ কারাগারে যাওয়া যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমের জামিন মঞ্জুর

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল-  রাজধানীতে আলোচিত ঘটনার পর দেড় মাসের শিশুসহ কারাগারে যাওয়া যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগম অবশেষে জামিন পেয়েছেন। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাত…

ট্রাইব্যুনালে ঘুষকাণ্ডে প্রসিকিউটর সাইমুমের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে আলোচিত ঘুষকাণ্ডে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলা…

ইরান কেন বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল-  মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের…

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ: আইএমএফ

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি বছরে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতের তুলনায় এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। যদিও সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au