মেলবোর্ন, ৭ অক্টোবর- মিসরের রাজধানী কায়রোতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। সোমবার শুরু হওয়া এই আলোচনাকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক “গুরুত্বপূর্ণ মোড়” হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলোচনার প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, “আমাদের একটি বড় সুযোগ এসেছে— আমি বিশ্বাস করি, এই চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।”
ফিলিস্তিনি ও মিসরীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম দফার আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সম্ভাব্য বন্দি বিনিময় চুক্তির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, হামাসের হাতে থাকা সব ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের একাধিক বন্দিকে মুক্তি দেবে।
এই শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। সেই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে বন্দি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যা দুই বছর ধরে চলমান।
গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজার ১৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ হাজার শিশু। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমাদের সামনে একটি বড় সুযোগ এসেছে। আমি মনে করি, আমরা এমন একটি চুক্তি করতে যাচ্ছি যা কেবল যুদ্ধ থামাবে না, বরং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করবে।”
ট্রাম্প আরও বলেন, হামাস তাদের পক্ষ থেকে শান্তি পরিকল্পনার কিছু অংশে সম্মতি জানিয়েছে, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। এর মধ্যে রয়েছে—হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং ভবিষ্যতে গাজার সরকারে তাদের অংশগ্রহণ না করার শর্ত।
এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন—
- মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ,
- ট্রাম্পের জামাই ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার,
- এবং কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি।
তাদের সঙ্গে আছেন মিসরের গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং জাতিসংঘের শান্তি বিষয়ক প্রতিনিধি।
ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হামাসের রাজনৈতিক শাখার জ্যেষ্ঠ সদস্য খালেদ আল-মিশাল, আর ইসরায়েলের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশেষ উপদেষ্টা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রথম সেশনটি “গঠনমূলক” হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
একজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, “আমরা বিশ্বাস করি, আলোচনার পরিবেশ ইতিবাচক। তবে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মতি পাওয়া যায়নি।”
প্রথম দিনের আলোচনায় ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-যুদ্ধবিরতি,৪৮ জন ইসরায়েলি বন্দির মুক্তি,এবং গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানোর অনুমোদন।
তবে ইসরায়েলি সূত্র বলছে, ওই ৪৮ বন্দির মধ্যে মাত্র ২০ জন জীবিত আছেন।
চুক্তি কার্যকর হলে বিনিময়ে গাজার শতাধিক ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পাবেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, বন্দি বিনিময় বিষয়ে তিনি আশাবাদী হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, “এই চুক্তিতে কোথাও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ নেই। আমরা সে বিষয়ে কখনোই সমর্থন দেব না।”
অন্যদিকে, হামাসের মুখপাত্র ইসমাইল রিদওয়ান বলেছেন, “আমরা ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বন্দি বিনিময় সূত্র অনুযায়ী সব ইসরায়েলি বন্দি মুক্তি দিতে রাজি— তবে এটি হবে পারস্পরিক শর্তের ভিত্তিতে।”
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস এই উদ্যোগকে “একটি নতুন সুযোগ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, “ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এই ভয়াবহ সংঘাতের অবসান ঘটানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এখন পক্ষগুলোকে সাহসী হতে হবে।”
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারও মার্কিন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আমরা এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য চাই, যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি শিশুরা একে অপরের পাশে নিরাপদে বেড়ে উঠবে।”
অপ্রত্যাশিতভাবে, হামাসের অন্যতম প্রধান মিত্র ইরানও এই পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “যদি এই আলোচনার মাধ্যমে গাজার মানুষের কষ্ট কমে এবং দখলদার বাহিনী পিছু হটে, তাহলে আমরা সেটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখি।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নরম অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আলোচনার মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ জন নিহত এবং ৯৬ জন আহত হয়েছেন।
মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েল সহায়তা ট্রাকের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, ফলে খাদ্য ও ওষুধের সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
ইসরায়েলি সেনারা গাজার বহু এলাকায় বাসিন্দাদের সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে, যা নতুন করে উদ্বাস্তু স্রোত সৃষ্টি করেছে।
মিসরের আলোচনাকে অনেক পর্যবেক্ষক গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্পের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং ইসরায়েল–হামাস উভয় পক্ষের অংশগ্রহণে আলোচনার এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে এটি দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে সমঝোতার পথে বাধাও কম নয়— বিশেষ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রশ্নে নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থান এবং হামাসের অস্ত্রসমর্পণ বিষয়ে অনীহা।
সব নজর এখন কায়রোতেই— সেখানেই নির্ধারিত হবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘ যুদ্ধ কি অবশেষে শান্তির দিকে এগোবে, নাকি আবারো ব্যর্থ আলোচনার খাতায় নাম লেখাবে।
সূত্র : বিবিসি