‘পুশ-ইন’ নিয়ে কি ঘটছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে? সমাধান কি?
মেলবোর্ন, ১৮ জুন- ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত জটিল নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক…
মেলবোর্ন, ১৮ জুন- বাংলাদেশের সমাজে সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। কিন্তু বিগত দুই দশকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে উগ্রবাদী চিন্তা-চেতনার কিছু বিচ্ছিন্ন উত্থান দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই ইস্যু নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উগ্রবাদ মোকাবিলা এখন শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
উগ্রবাদের উত্থান: প্রেক্ষাপট ও কারণ
উগ্রবাদ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে—গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতা দিয়ে লক্ষ্য অর্জনের চিন্তা। বাংলাদেশে এর উত্থানের পেছনে ৫টি স্তর কাজ করেছে:
ক. রাজনৈতিক শূন্যতা ও মেরুকরণ: ১৯৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, তখন বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন CRI এর ২০২৪ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণদের ৩৪% মনে করে “রাজনীতি তাদের সমস্যার সমাধান দেয় না”। এই হতাশা থেকে কেউ কেউ বিকল্প পথ খোঁজে।
খ. সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য: বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯%, ২০২৪ সালে তা ১৮.৭% এ নেমেছে। অগ্রগতি সত্ত্বেও আয়বৈষম্য বেড়েছে। গিনি সহগ ২০১০ এ ছিল ০.৩২, ২০২২ এ ০.৩৯। বেকার যুবক, শহরে আসা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহজেই মৌলবাদী বয়ানের টার্গেট হয়।
গ. বৈশ্বিক জিহাদি বয়ানের প্রভাব: ২০০১ পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার ঘটনা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে পৌঁছায়। গ্লোবাল টেররিজম ডাটাবেস GTD অনুযায়ী, ২০০৫-২০১৬ সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ২০১৬ এর গুলশান হামলা এর চূড়ান্ত উদাহরণ। তদন্তে দেখা যায়, হামলাকারীরা অনলাইন প্রপাগান্ডা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
ঘ. শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার ফাঁক: ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসার ৯৫% কওমি ও আলিয়া ধারা। এদের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ ইসলাম চর্চা করে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানে আধুনিক বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব থাকে। ইউনেস্কোর ২০১৯ রিপোর্ট বলে, কারিকুলামে “নাগরিকত্ব, সহনশীলতা” বিষয় যুক্ত করলে উগ্র চিন্তা ৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
ঙ. প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া: ২০২৪ সালের BTRC তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৩ কোটি। ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রামে উগ্র বয়ান অ্যালগরিদমের কারণে দ্রুত ছড়ায়। ১টা ভিডিও ২৪ ঘণ্টায় ১০ লাখ ভিউ পায়। এখানে ফ্যাক্ট-চেকিং দুর্বল।
২. ২০২৪ এর ৫ আগস্ট : পরিবর্তিত বাস্তবতা ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কমে যায়, কারাগার থেকে কিছু আসামি বের হয়, এবং বিভিন্ন এলাকায় “শূন্যতা” তৈরি হয়।
এই সময়ে ৩ ধরনের প্রভাব দেখা যায়:
প্রথম, কারাগার ও মামলার প্রভাব: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ এর তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট পরবর্তী ৩০ দিনে ১৭টি জেল থেকে ২৩০০০+ বন্দি মুক্তি পান। এদের মধ্যে জঙ্গি মামলার কিছু আসামিও ছিলেন। অনেকে জেলখানার গেইট ভেঙে বের হয়ে আসে। জামিন বা মামলা প্রত্যাহারের কারণে তারা সমাজে ফিরে আসেন তা পরিস্কার জানানো হয়নি । রাষ্ট্রের নজরদারি কম থাকায় তাদের পুনঃসংগঠনের ঝুঁকি বাড়ে।
দ্বিতীয়, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের ওপর হামলা: ৫ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত Ain o Salish Kendra ASK এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৪৭৮টি সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে মন্দির, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা অন্তর্ভুক্ত। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই সুযোগে “ধর্মীয় শুদ্ধি”র বয়ান ছড়ায়। যদিও বেশিরভাগ হামলা স্থানীয় বিরোধ বা লুটপাটের ঘটনা, তবে উগ্র বয়ান এগুলোকে বৈধতা দেয়।
তৃতীয়, অনলাইন র্যাডিকেলাইজেশন বৃদ্ধি: পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রীয় সাইবার মনিটরিং কমে যায়। Cyber Threat Alliance এর ২০২৪ Q3 রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ IP থেকে জিহাদি কনটেন্ট শেয়ার ৬৩% বেড়েছে। টেলিগ্রাম চ্যানেলে নতুন ৪০০+ বাংলা ভাষার চ্যানেল খোলা হয়। এগুলোতে “নতুন বাংলাদেশে ইসলামী শাসন” এর আহ্বান জানানো হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মানুষের বড় অংশ এখনো উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। ২০২৪ এর সেপ্টেম্বরে একটি বেসরকারি জরিপে ৮১% মানুষ বলেছেন, “ধর্মের নামে সহিংসতা তারা সমর্থন করে না”।
৩. আন্তর্জাতিক বাস্তবতা: বিশ্ব কী করছে?
উগ্রবাদ এখন আর কোনো এক দেশের সমস্যা না। UN Security Council এর রেজুলেশন ২৩৯৬ অনুযায়ী, সব দেশকে “Preventing Violent Extremism PVE” নীতিতে যেতে বলা হয়েছে। ৩টি আন্তর্জাতিক মডেল আছে:
ডেনমার্ক মডেল – Aarhus Model: ২০১৩ থেকে ডেনমার্ক সিরিয়াগামী তরুণদের “শাস্তি না দিয়ে ফেরানো” নীতি নেয়। কাউন্সেলিং, চাকরি, মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়। ফল: ২০১২-২০১৫ এ সিরিয়াগামী ডেনিশ নাগরিক ১৫০+ জন। ২০১৮-২০২৩ এ ৫ জনের কম।
যুক্তরাজ্য মডেল – Prevent Strategy: স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ডাক্তারদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। তারা র্যাডিকেলাইজেশনের লক্ষণ দেখলে রিপোর্ট করে। ২০১৫-২০২৩ পর্যন্ত ১ লাখ+ রেফারেল, এর ৮০% ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং দিয়েই সমাধান।
ইন্দোনেশিয়া মডেল – BNPT: ইন্দোনেশিয়া কারাগারে জঙ্গিদের “ডির্যাডিকেলাইজেশন” প্রোগ্রাম চালায়। ধর্মীয় পণ্ডিত, মনোবিজ্ঞানী ও সাবেক জঙ্গি মিলে কাজ করে। ২০১০-২০২৩ এ ৭০+ জঙ্গি প্রোগ্রাম শেষ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে।
বাংলাদেশ ২০১৬ এর পর “Zero Tolerance Policy” নেয়। র্যাব, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট CTU, NSI একসাথে কাজ করে। ২০১৭-২০২৩ এ ১৫০+ জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস, ৫০০+ গ্রেপ্তার। এটা নিরাপত্তা দিক থেকে সফল।
৪. প্রতিকার: বাংলাদেশের জন্য ৬ দফা রোডম্যাপ
বিশ্বের বাস্তবতা ও বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো মিলিয়ে ৬টি কাজ জরুরি:
১. আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ফেরানো: উগ্রবাদ সবচেয়ে বেশি জন্মায় যখন মানুষ বিচার পায় না। পুলিশ, আদালত, প্রশাসনকে রাজনীতির বাইরে রেখে শক্তিশালী করতে হবে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে থানা, আদালত যে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। এখন দ্রুত জনগণের আস্থা ফেরানো প্রথম কাজ করা।
২. শিক্ষা কারিকুলামে “নাগরিক সহনশীলতা”: প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে ধর্ম, জাতি, ভাষার পার্থক্য মেনে চলার শিক্ষা যুক্ত করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান, আইটি, ইংরেজি বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২০৩০ এর মধ্যে আলিয়া-কওমি-জেনারেল শিক্ষার ব্রিজ কোর্স চালু করা যায়।
৩. অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি: যুব বেকারত্ব ১৫.৬% – বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২৩। প্রতি উপজেলায় ১০ জন তরুণের স্কিল ট্রেনিং ও ক্ষুদ্রঋণ দিলে তারা উগ্র বয়ানের বাইরে থাকবে। “একটি বাড়ি একটি খামার” মডেলকে ডিজিটাল স্কিলের সাথে যুক্ত করা যায়।
৪. অনলাইন কাউন্টার ন্যারেটিভ: সরকার ও বেসরকারি সংস্থা মিলে বাংলা ভাষায় যুক্তি-ভিত্তিক কনটেন্ট বানাতে হবে। ইউটিউবে ইসলামী পণ্ডিত, মনোবিজ্ঞানী, সাবেক জঙ্গি দিয়ে “উগ্রবাদের মিথ ভাঙা” সিরিজ চালানো যায়। মেটা, গুগলের সাথে চুক্তি করে ঘৃণামূলক কনটেন্ট ৬ ঘণ্টার মধ্যে নামাতে হবে।
৫. কমিউনিটি পুলিশিং ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ভূমিকা: প্রতিটি ইউনিয়নে ইমাম, শিক্ষক, চেয়ারম্যান, মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে “শান্তি কমিটি”। তারা স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা করবে, উগ্র বয়ান ধরিয়ে দেবে। ২০০৫-২০১০ এ জামায়াতুল মুজাহিদিনের উত্থানের সময় রাজশাহী অঞ্চলে এই মডেল কাজ করেছিল।
৬. পুনর্বাসন ও ডির্যাডিকেলাইজেশন: যারা ভুল করে জঙ্গি সংগঠনে গেছে কিন্তু হত্যায় জড়িত না, তাদের জন্য কারাগারে ৬ মাসের কাউন্সেলিং কোর্স। ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন, পরিবারের সাথে যোগাযোগ, মুক্তির পর চাকরির ব্যবস্থা। এটা না করলে জেল থেকে বের হয়ে তারা আরও কঠোর হয়।
৫. বাংলাদেশের শক্তি: ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হলো এর সংস্কৃতি। লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের চিন্তা অসাম্প্রদায়িক। গ্রামে এখনো হিন্দু-মুসলিম একসাথে পালা-পার্বণ করে। ১৯৭১ এ রাজাকার-আলবদরের বিরুদ্ধে পুরো জাতি লড়েছে।
বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্রের গবেষণা বলে, ১৯৪৭ এর দাঙ্গার সময়ও খুলনা-যশোর অঞ্চলে বহু মুসলিম পরিবার হিন্দু প্রতিবেশীকে লুকিয়ে রেখেছিল। এই মানবিকতা উগ্রবাদের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক।
কঠোরতা নয়, কৌশল দরকার:
উগ্রবাদ দমন করতে শুধু বন্দুক-গুলিই যথেষ্ট না। কঠোর নিরাপত্তা দরকার, কিন্তু তার সাথে লাগবে মন জয়ের কৌশল। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর বাংলাদেশ এক নতুন অধ্যায়ে। এই সময়ে যদি রাষ্ট্র আইনের শাসন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তাইলে উগ্রবাদী গোষ্ঠী জনসমর্থন পাবে না।
বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত—একদল ঘৃণা ছড়ায়, আরেক দল সংলাপ চায়। বাংলাদেশের অবস্থান সবসময় সংলাপের পক্ষে। কারণ আমাদের মাটি, নদী, মানুষ—সবাই মিলেমিশে থাকতে শিখেছে।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত
উগ্রবাদের ছায়া যতই দীর্ঘ হোক, সূর্য উঠলে তা মিলিয়ে যায়। বাংলাদেশের সূর্য হলো ১৯৭১ এর চেতনা, বাংলা ভাষা ও মানুষের সহনশীলতা। এই শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারলেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে।
লেখক- সরদার সেলিম রেজা; রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au