জেনারেল জিয়াউর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ অক্টোবর- বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৭ সাল এক রক্তাক্ত ও ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। সেই সময় জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও পরবর্তী গণফাঁস এখনো দেশজুড়ে বিতর্ক ও শোকের বিষয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই সময় রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে সেনাবাহিনীর শত শত সদস্যকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়—যা ছিল এক পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নগ্ন প্রদর্শন।
১৯৭৭ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হয় নির্বিচার দমন অভিযান। মাত্র দুই মাসে ১,১০০-রও বেশি সেনাসদস্য এবং বহু নিরীহ মানুষকে কোনো বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বন্দিদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন, তাদের দেহ বিকৃত করে গোপনে গণকবরে ফেলা হয়।
তৎকালীন তথাকথিত “বিচারপ্রক্রিয়া” ছিল সম্পূর্ণ প্রহসন। অভিযুক্তদের আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি, অনেককে ভুলভাবে অভিযুক্ত করে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গোপনে লাশ দাফন করা হয়, যাতে এই হত্যাযজ্ঞের কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট না থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় আধিপত্য ও ভয় দেখানোর এক প্রকাশ্য ঘোষণা—বিরোধিতা করলে মৃত্যু অবধারিত।
দীর্ঘ পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনাগুলোর পূর্ণ সত্য আজও আড়ালে রয়ে গেছে। সরকারি নথি গোপন বা ধ্বংস করা হয়েছে, এবং কোনো সরকারই এই গণহত্যার তদন্তে আগ্রহ দেখায়নি। নিহত সেনাসদস্যদের পরিবার এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীরবতা তাদের শোককে আরও গভীর করেছে।
জাতীয়তাবাদের আড়ালে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক দমনমূলক শাসনব্যবস্থা। গণফাঁস ও নির্যাতন ছিল তার ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার। বিশ্লেষকদের মতে, তার শাসনামলে সেনাবাহিনী পরিণত হয় দমনযন্ত্রে, যা গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে পশ্চিমা ও ইসলামী মিত্র দেশগুলোর কৌশলগত স্বার্থে বাংলাদেশের এই মানবাধিকার লঙ্ঘন উপেক্ষিত ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই নীরবতা আসলে জিয়ার শাসনকে বৈধতা দেয় এবং রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞকে উৎসাহিত করে।
আজও ১৯৭৭ সালের গণহত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত ক্ষত। বহু গণকবরের অবস্থান অজানা, এবং নিহতদের স্মরণে কোনো সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্র যদি এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি না হয়, তবে দায়হীনতার সংস্কৃতি ও দমননীতির উত্তরাধিকার দেশকে আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।
১৯৭৭ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ও গণফাঁস ইতিহাসে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে গেছে—অসীম ক্ষমতা, ন্যায়বিচারের অভাব ও মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
বাংলাদেশের এই অন্ধকার অধ্যায় শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি এক কঠিন শিক্ষা—ন্যায়বিচার ও সত্যের মুখোমুখি না হলে ইতিহাস নিজেকে আবারও পুনরাবৃত্তি করবে, হয়তো আরও ভয়াবহভাবে।