বাংলাদেশ

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি

  • 8:39 pm - September 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৮৪২ বার
মানিক লাল ঘোষ

​বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র, ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার হাত ধরে এ অঞ্চলের বহু রাজনৈতিক নেতার বিকাশ ঘটেছিল। তাঁর রাজনৈতিক সুধা ও দূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় সোনালী ফসল ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সোহরাওয়ার্দীর জন্মদিনে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন এবং বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে তাঁর ছায়াতলে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিবের সম্পর্কের রসায়ন এক গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে।

​১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে জন্ম নেওয়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একাধারে তুখোড় আইনজীবী, অসাধারণ সংগঠক এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। অবিভক্ত বাংলার শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী ত্রয়ীর অংশ হিসেবে তিনি বঞ্চিত পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা শুধু ক্ষমতার মোহগ্রস্ত ছিল না, বরং তিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা—যাঁকে নিখাদ ভালোবাসায় সাধারণ মানুষ ‘শহীদ সাহেব’ বলে ডাকত।
​

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি ও আদর্শিক গুরুদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে কাছের চালিকাশক্তি। ১৯৩৮ সালের কথা। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র কিশোর শেখ মুজিবের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সংবর্ধনা দেওয়ার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী পরিচালনার।

স্কুল পরিদর্শন শেষে ফেরার সময় লঞ্চঘাট পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দীকে এগিয়ে দিয়েছিলেন কিশোর মুজিব। ভাঙা ভাঙা বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর করা সাধারণ প্রশ্নের সাবলীল উত্তর এবং মুজিবের চোখে-মুখে থাকা নেতৃত্বের দীপ্তি সেদিনই নজর কেড়েছিল এই নেতার। নোটবুকে নাম-ঠিকানা টুকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “মুজিবর কলিকাতা আসিলে আমার সঙ্গে দেখা করিবে।” এই ছোট্ট বাক্যটিই পাল্টে দিয়েছিল বাংলার ভবিষ্যৎ ইতিহাস।

​পরবর্তীতে কলকাতায় গিয়ে যখন মন্ত্রীর বাড়ির দারোয়নের বাধা পেরিয়ে সেই কার্ডটি দেখালেন শেখ মুজিব, তখন থেকেই শুরু হয় নতুন এক পথচলা। সোহরাওয়ার্দী তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, ‘ম্যাট্রিক তো পাস করে ফেলেছ, এখানেই কলেজে ভর্তি হও। আমার সঙ্গেও কাজ করো।’ এরপর নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগের প্রাদেশিক শাখায় কাজ শুরু করেন তরুণ মুজিব। মুসলিম লীগ বিভক্ত হলে সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের অনুসারী হয়ে মাঠের রাজনীতিতে আরও পোক্ত হয়ে ওঠেন তিনি।

​বঙ্গবন্ধুকে তিনি নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। তার প্রমাণ মেলে বঙ্গবন্ধুর প্রথম লাহোর সফরে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নির্দেশে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী পার্টি গঠনের বিষয়ে পরামর্শ করতে লাহোরে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছিলেন মুজিব। শীতের কাপড়টুকুও সঙ্গে ছিল না, আর সোহরাওয়ার্দীও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। দুই দিন পর সোহরাওয়ার্দী ফিরে যখন জানতে পারলেন, তখন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, নিজে হোটেল ঠিক করে দেন এবং দোকানে নিয়ে গিয়ে শীতের জামাকাপড় কিনে দেন। সারাদিন রাজনৈতিক আলাপ আর সান্নিধ্যে কেটেছিল সেই দিনগুলো।

​প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে ১৯৫৮ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ঢাকায় এসে সোহরাওয়ার্দী বুঝতে পেরেছিলেন, শেখ মুজিব হলেন সেই ‘কাঁচা হিরের টুকরা’, যাকে সামান্য দিকনির্দেশ দিতে পারলেই পূর্ব বাংলা তার সবচেয়ে বলিষ্ঠ নেতা পাবে। পরাক্রমশালী নেতার প্রতি আজীবন অকৃত্রিম শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বসে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করেছেন সেই দিনগুলোর কথা—কীভাবে সোহরাওয়ার্দী তাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন, শিখিয়েছিলেন মানুষের অধিকারের জন্য লড়তে।

​জীবনসায়াহ্নে এসে রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে নিঃসঙ্গ দিন কাটাতে হয় এই মহান নেতাকে। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের বৈরুতের একটি হোটেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মৃত্যুর পর তৎকালীন আইয়ুব খানের সরকার তাঁর মরদেহ ঢাকায় দাফন করতে বাধা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাংলার সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ও বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ পদক্ষেপে তাঁর মরদেহ ঢাকায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়।

​১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে ঐতিহাসিক এক ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন সেই বজ্রবাণী—”আজ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে বাংলাদেশ।” এটি কেবল একটি নাম পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্ন এবং তাঁরই শিখিয়ে যাওয়া আদর্শের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। সোহরাওয়ার্দীর জন্মদিনে এই মহান নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, যাঁর হাত ধরে বাঙালি পেয়েছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র।

এই শাখার আরও খবর

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন, ডিএনএ পরীক্ষায় ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে নিখোঁজ…

৪৪০ সরকারি সেবার মাইগভ বন্ধ, ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রায় ৪৪০টি সেবা পাওয়া যায় এমন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মাইগভের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ। জরুরি নথি সত্যায়ন, জমিসংক্রান্ত সেবা, বিভিন্ন…

ব্যালন ডি’অরে কে কোন পুরস্কার জিতলেন

কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিন ইয়ামালকে পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের পুরুষদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও বায়ার্ন মিউনিখের তারকা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। অন্যদিকে, নারীদের ব্যালন…

‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় আটক, প্রতিবাদের মুখে ছাড়া পেলেন দীপক শীল

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট: রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধন থেকে আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। সোমবার (২৬ অক্টোবর)…

হাম সতর্কবার্তা, বাংলাদেশে ডিপথেরিয়া ও পোলিও ছড়ানোর আশঙ্কা

বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতিকে দেশের টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতার সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে হাম ছাড়াও ডিপথেরিয়া, হুপিং…

দেশে সড়কে বছরে আহত ৩০ লাখ মানুষ, কেন এত দুর্ঘটনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর আহত হচ্ছেন প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। প্রাণ হারাচ্ছেন দৈনিক গড়ে ৬৬ জন, আর স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au