Source- Harvard International review
মেলবোর্ন, ২৪ অক্টোবর: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দলটির অতীত কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে বিনা শর্তে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাই।”
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও গণধর্ষণের সহযোগী একটি সংগঠন এত সহজে কি শুধুই কথার মাধ্যমে তাদের অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে পারে?

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা (ছবি: সংগৃহীত)
২৫ মার্চের কালরাত্রি ও গণহত্যার সূচনা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” নামে এক বর্বর অভিযান চালিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে। তখনকার পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে বলেছিলেন, “তিন মিলিয়নকে মেরে ফেল, বাকিরা আমাদের মারা হাতে খাবে।”
এই নির্দেশের পরপরই শুরু হয় বাঙালিদের ওপর নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রাবাস, হাসপাতাল, সংবাদপত্র অফিস, ঘরবাড়ি কোথাও রক্ষা পায়নি মানুষ। Asia Times ও Harvard International Review-এর তথ্য অনুযায়ী, ঐ অভিযানে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত এবং দুই থেকে চার লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হন।
বুদ্ধিজীবী হত্যার কালো অধ্যায়
দেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রায় শেষের পথে, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনী আল-বদর ও আল-শামস পরিকল্পিতভাবে দেশকে মেধাশূন্য করতে বেছে নেয় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস। এই দিনে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর হাতে শহীদ হন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা ড. মুনীর চৌধুরী, ড. আলীম চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন, লেখক ও শিক্ষাবিদ শহীদুল্লাহ কায়সারসহ অসংখ্য জ্ঞানী মানুষ। এদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজার, নাখালপাড়া, মোহাম্মদপুর, চাঁদপুর, যশোর, কুমিল্লা ও রাজশাহীর মাটি।
রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস: পাকিস্তানের দোসর বাহিনী
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে গঠিত হয় রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী।
রাজাকার বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৫ দিনের কোর্স দিয়ে; প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয় ১৪ জুলাই ১৯৭১ কুষ্টিয়ায়। ২৭ নভেম্বর ১৯৭১ সাভারে রাজাকার কোম্পানি কমান্ডারদের প্রথম ব্যাচের বিদায় কুচকাওয়াজে উপস্থিত ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় সেনা অধিনায়ক জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজী।
পরবর্তী পর্যায়ে এই বাহিনী স্বাধীন অধিদপ্তরের মর্যাদা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে রাজাকার বাহিনীর বিলুপ্তি ঘটে।
রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, যিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে “দুষ্কৃতকারী” আখ্যা দিয়ে প্রতিরোধের আহ্বান জানান।
তার নেতৃত্বে গঠিত হয় আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী যার নেতৃত্বে ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা প্রমুখ।
আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেয়, নারীদের ওপর ধর্ষণ ও নির্যাতনে অংশ নেয়, এবং রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইসলামের ইতিহাসে “বদর যুদ্ধ” থেকে নাম ধার করা হলেও তাদের কাজ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত একটি বর্বর হত্যাযজ্ঞ। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানপন্থী মতাদর্শ রক্ষা করা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধ্বংস করা।
ইতিহাসের বিচারে ক্ষমার স্থান নেই
আজ যখন জামায়াতে ইসলামী নেতারা নিঃশর্ত ক্ষমা চান, তখন প্রশ্ন ওঠে এই ক্ষমা কাদের জন্য? যাদের সন্তানদের রক্তের নদী বইয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসর রাজাকার–আল-বদর বাহিনী, সেই শহীদদের আত্মা কি এভাবে শান্তি পাবে? ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, লাখো নারীর সম্ভ্রমহানি, মেধাবী জাতির সন্তানদের নির্মম হত্যা এসব অপরাধ শুধুমাত্র ক্ষমা চাওয়ার শব্দে ধুয়ে যায় না।
একটি সংগঠন, যারা ইতিহাসের অন্যতম বড় গণহত্যার অংশীদার, তাদের দায় এড়ানোর কোনো নৈতিক অধিকার নেই।
মানব ইতিহাসের এত বড় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, এত অমানবিক নির্যাতনের সহযোগী হয়ে, এখন যদি শুধুমাত্র ক্ষমতার মসনদে বসার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহলে সেটি কেবল জাতির সঙ্গে এক নতুন প্রতারণা। ইতিহাস তোমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ শহীদের রক্ত মাটিতে মিশে গেছে, কিন্তু ইতিহাস থেকে কখনো মুছে যাবে না।
ড: প্রদীপ রায়, সম্পাদক, ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন
২৪ অক্টোবর