“বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। শুধুমাত্র স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই এই দেশের ক্ষত সারাতে পারে।”- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মেলবোর্ন ২৯ অক্টোবর: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, তিনি গত বছরের সহিংস বিক্ষোভে নিহতদের জন্য ক্ষমা চাইবেন না।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এ প্রকাশিত এক বিরল ও বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি জাতি হিসেবে হারানো প্রতিটি সন্তান, ভাই, বোন ও বন্ধুর জন্য শোক প্রকাশ করি; কিন্তু আমি সেই অভিযোগ স্বীকার করতে পারি না যে, আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম।”
“আমার বিচার একটি ভুয়া নাটক” হাসিনার অভিযোগ
বাংলাদেশের প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে মৃত্যুদণ্ডের দাবি করেছেন। অভিযোগ তিনি ছাত্রদের বিক্ষোভ দমন করতে পুলিশের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন, যাতে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছেন। তিনি বলেন,
“এই বিচার একটি ‘ভুয়া নাটক’। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছুই নয়। অ-নির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি আদালত আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চায়। আমি অবাক হব না, আবার ভীতও নই।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই আদালত “রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা পরিচালিত” এবং “বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এটি আরেকটি অধ্যায়।”

“থাকলে শুধু আমার জীবনই নয়, আমার চারপাশের মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ত। আমি বাধ্য হয়েছিলাম দেশ ছাড়তে।”সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
“সহিংসতা ছিল শৃঙ্খলা ভাঙনের ফল”
হাসিনা বলেন, বিক্ষোভের সময় তার সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল একটি “সহিংস বিদ্রোহ” মোকাবিলার পদক্ষেপ।
তিনি বলেন,
“নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। নেতা হিসেবে আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, তবে এটি বলা ভুল যে আমি গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম বা তা চেয়েছিলাম।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার সরকার বিক্ষোভে প্রথম দিকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত শুরু করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই তদন্ত বন্ধ করে দেয়।
বিক্ষোভ, রক্তপাত ও পতন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ধীরে ধীরে আন্দোলনটি সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, এবং সরকার কঠোর হাতে দমন অভিযান চালায়। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সে সময় বলেছিল,
“বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবাদ দমন ও মতপ্রকাশের অসহিষ্ণুতার এক ভয়াবহ উদাহরণ এটি।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টার্ক ঘটনাটিকে আখ্যায়িত করেন “ছাত্রদের ওপর হামলা বিশেষভাবে নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য।”
শেখ হাসিনা এই সংখ্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি,
“১,৪০০ মৃত্যুর সংখ্যা একটি অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক প্রচারণা। সত্যিকারের সংখ্যা তার চেয়ে কম।”
“দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম” হাসিনার ব্যাখ্যা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। তার দাবি,
“থাকলে শুধু আমার জীবনই নয়, আমার চারপাশের মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ত। আমি বাধ্য হয়েছিলাম দেশ ছাড়তে।”
তিনি বলেন, নিজের আওয়ামী লীগ দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
“একটি অ-নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন আয়োজন করছে, যেখানে আমার দলকেই প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক নয়।”
ইউনূস সরকারের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস হাসিনার পতনের তিন দিন পর দেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ঘোষণা দেন যে, আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম শেখ হাসিনাকে আখ্যা দিয়েছেন
“ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিদ্রোহে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও স্থপতি।”
এর জবাবে হাসিনা বলেন,
“এই অভিযোগ ভিত্তিহীন, বিকৃত সাক্ষ্য ও প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মাঠ পর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলো ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, সরকারের নির্দেশ নয়।”
“আমার লক্ষ্য এখনো গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা”
নির্বাসিত জীবনে থেকেও শেখ হাসিনা দাবি করেন,
“বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। শুধুমাত্র স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই এই দেশের ক্ষত সারাতে পারে।”
তিনি বলেন,
“আমি চাই ইতিহাস আমাকে স্মরণ করুক সেই নেতা হিসেবে, যিনি ১৯৯০-এর দশকে সামরিক শাসনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু আজ সেই অর্জনগুলো হুমকির মুখে।”
সূত্র: The Independent | প্রতিবেদন: মারূষা মুজাফফর | অনুবাদ ও সম্পাদনা: OTN Bangla আন্তর্জাতিক ডেস্ক