বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর “সুবিধাভিত্তিক জোট” গঠনের ইঙ্গিত

  • 9:40 am - October 30, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৫৩ বার

মেলবোর্ন ৩০ অক্টোবর ২০২৫: বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে দেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো কি মতাদর্শগত বিভাজন কাটিয়ে একটি প্রাক-নির্বাচনী জোট গঠন করতে পারবে, নাকি আগের অর্ধশতাব্দীর মতো স্বল্পস্থায়ী ফ্রন্টের পুনরাবৃত্তি হবে?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা ইসলামী দলগুলো এখন নির্বাচনী সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চায়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস নিশ্চিত করেন যে জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইসলামী দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে একজোট হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সম্ভাব্য জোটটি মূলত সুবিধাভিত্তিক, অর্থাৎ মতাদর্শ নয় বরং আসন ভাগাভাগি ও টিকে থাকার হিসাবেই গঠিত হতে পারে।

দুই ধারার ইসলামী রাজনীতি

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিকে মূলত দুটি ধারায় ভাগ করা যায় ‘সংস্কারপন্থী’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’।
সংস্কারপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (বিজেআই), যারা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং নিজেদেরকে শুধুমাত্র একটি ইসলামী দল নয়, বরং রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। বিজেআই-এর আমির সম্প্রতি দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা জানান, যা অনেক রক্ষণশীল মুসলমান ‘অগ্রহণযোগ্য’ বা ‘বিদ্বেষমূলক’ বলে সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে, প্রতিক্রিয়াশীল ধারার নেতৃত্বে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)। তারা বর্তমান ব্যবস্থাকে ‘জাহেলি সমাজব্যবস্থা’ বলে আখ্যা দেয় এবং ইসলামি আদর্শে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

ইতিহাসে ঐক্যের ব্যর্থতা

স্বাধীনতার পর থেকেই ইসলামী দলগুলোর ঐক্য প্রচেষ্টা ব্যর্থতার ইতিহাস বহন করে। ১৯৭৬ সালে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, খেলাফত-ই-রব্বানি পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ গঠিত হয়। তবে ১৯৭৯ সালের মধ্যেই তা ভেঙে যায়।
১৯৮১ সালে কওমি মাদ্রাসা-ভিত্তিক নেতারা উলামা ফ্রন্ট গঠন করেন হাফেজ্জি হুজুরের নেতৃত্বে, কিন্তু ১৯৮৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেটিও টিকে থাকেনি। ১৯৯০ সালে ছয় দলীয় ইসলামী ঐক্য জোট গঠিত হয় ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে, তবে সেটিও টেকেনি।

নতুন জোটের সম্ভাবনা ও বিভাজন

২০২৫ সালের শুরু থেকেই ইসলামী দলগুলোর মধ্যে পুনরায় জোট আলোচনা শুরু হয়। ২১ জানুয়ারি বারিশালে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের বৈঠকে নির্বাচনের আগে সহযোগিতার ঘোষণা আসে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই, জুলাইয়ে আইএবি-এর আমির নেজামে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে বৈঠক করে চার দলীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করেন যেখানে জামায়াতকে বাদ দেওয়া হয়।

কওমি নেতারা মনে করেন, জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ’লা মওদূদীর তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সুন্নি ও দেওবন্দি ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর আমির শাহ মুঈব্বুল্লাহ বাবুনগরী সতর্ক করে বলেন, “যদি জামায়াত ক্ষমতায় আসে, তাহলে কওমি ও দেওবন্দি মাদ্রাসাগুলোর অস্তিত্ব থাকবে না।”
এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে জামায়াতের শুভেচ্ছা বার্তা এই মতপার্থক্য আরও তীব্র করেছে।

একক ইস্যুতে সাময়িক ঐক্য

যদিও মতাদর্শে পার্থক্য আছে, কিছু ইস্যুতে সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকাজুড়ে ছয়টি ইসলামী দল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টি একযোগে সমাবেশ ও মিছিল করে। তারা নির্বাচনী সনদ অনুযায়ী নির্বাচন, সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশের দাবি জানায়। পাশাপাশি তারা আগের সরকারের দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার দাবি করে।

তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি

আনুষ্ঠানিক জোট: সুবিধাভিত্তিক নির্বাচনী জোট, যেখানে মতাদর্শ নয়, বরং আসন ভাগাভাগি ও ভোট কৌশলই মুখ্য হবে।
অঘোষিত সমন্বয়: প্রতিটি দল নিজ নিজ প্রচারণা চালাবে, তবে নির্বাচনী প্রশাসন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও কিছু আসনে পারস্পরিক সহনশীলতা দেখাবে।
কওমি-নির্ভর জোট (জামায়াত ছাড়া): ১৯৯০ সালের ইসলামী ঐক্য জোটের মতো একটি সীমিত জোট, যা নির্দিষ্ট আসনে প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দেবে।

যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, ইসলামী দলগুলোর সম্ভাব্য জোটটি আদর্শগত নয় বরং কৌশলগত ও সুবিধাভিত্তিক। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে স্পষ্ট হবে তারা একত্র হতে পারে কি না। কিন্তু ইতিহাস বলছে বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্যের প্রচেষ্টা বারবার ভেঙেছে মতাদর্শিক সীমারেখায়।

Source: East Asia Forum

এই শাখার আরও খবর

‘বাংলাদেশের পুজো এবার চমকে দেওয়ার মতো, সাবাশ বাংলাদেশ!’: ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

বাংলাদেশের দুর্গাপূজার আয়োজন ও প্রতিমার প্রশংসা করেছেন ভারতের টেলিভিশন উপস্থাপক ও সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের…

সাজেকে ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীর’ সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি, যা যা ঘটল সারাদিন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় সেনাবাহিনী ও একটি ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীর’ মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (২২…

লালপেড়ে সাদা শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর, পুজোর সাজে বাঙালিয়ানায় মুগ্ধতা ছড়ালেন নুসরাত

পুজোর সাজে সাবেকি বাঙালিয়ানার আবেদন বরাবরই আলাদা। লালপেড়ে সাদা শাড়ি, সোনার গয়না, কপালে লাল টিপ আর সিঁথিতে সিঁদুর, এই চেনা সাজেই যেন ধরা পড়ে বাঙালির…

সিঁদুর খেলতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তন্নি দে

বিয়ের মাত্র চার মাস, নতুন সংসারের স্বপ্ন ও বাবার বাড়িতে প্রথম দুর্গোৎসবের আনন্দ এক নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। বিজয়া দশমীতে দেবীর কপালে সিঁদুর দিতে গিয়ে…

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, কূটনৈতিক ব্যর্থতার দায় কে নেবে?

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমের খবর থেকে এ ঘটনা জানতে পেরেছেন। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিষয়টি জানতে…

চোরবাগান মণ্ডপে থ্রিডি স্ক্যান ফরেনসিক দলের, নকশা ও প্রবেশপথ খতিয়ে দেখছে সিট

কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থ্রিডি স্ক্যান করেছে ফরেনসিক দল। মণ্ডপের নকশা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের প্রস্থ এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au