অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১ নভেম্বর- রবিবার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ যখন আরেকটি সফল বিদেশ সফর শেষে আরএএএফের ভিআইপি সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন, কেউ কেউ ভাবছিলেন এবারও কি তিনি আরেকটি ব্যান্ডের টি-শার্ট পরবেন? হয়তো “ডেড কেনেডিস”-এরটা।
এর আগে হোয়াইট হাউস সফর শেষে তিনি “জয় ডিভিশন”-এর টি-শার্ট পরে ফিরেছিলেন, যা বিরোধী দলীয় উপনেতা সুসান লে-কে বেশ ক্ষুব্ধ করেছিল। এই সামান্য বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এটা দেখায় বিরোধী নেতারা কতটা মরিয়া হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করতে চাইছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের স্বস্তির সময়
অ্যালবানিজ এখন রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে স্বস্তিকর সময়ে আছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে সাধারণত যে সময় সরকার সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় থাকে, তিনি ঠিক সেই অবস্থায়। ভোটাররা প্রথমবারের সিদ্ধান্তে আস্থা রেখেছেন, বিরোধীদের অনেক সমালোচনা মিলিয়ে গেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সময়টা কি সরকারের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি, নাকি এটা এক শিখর, যেখান থেকে এখন নামা শুরু হবে?

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন। (ছবি: বিজয় ভাষণে- স্ক্রীনশট)
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক
এই সময়টা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় অ্যালবানিজের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক দেখলে।
তিনি সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক নিয়ে তার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, ফিলিস্তিন ও চীন বিষয়েও স্বতন্ত্র নীতি নিয়েছেন।
এক সাবেক লিবারেল মন্ত্রী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, ট্রাম্পকে সামলানোয় অ্যালবানিজ “অসাধারণ সাফল্য” দেখিয়েছেন।
মাত্র এক মাসে তিনবার ট্রাম্পের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের দেওয়া এক নৈশভোজে ট্রাম্পের পাশেই বসেছিলেন তিনি।
তবে সমালোচকরা এখনই হয়তো অভিযোগ তুলবেন, প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের দিকেই অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছেন, অন্য মিত্রদের উপেক্ষা করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি ভালো করছেন ঠিকই, কিন্তু কিছুই চিরস্থায়ী নয়।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম সামনাসামনি বৈঠকের পর নিউইয়র্কে তোলা একটি সেলফি শেয়ার করেছেন। ছবিঃ আলবানিজের ইনস্টাগ্রাম থেকে নেয়া
অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা
দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার যত পুরোনো হয়, তত স্পষ্ট হয় তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব।
এই সপ্তাহের মুদ্রাস্ফীতি প্রতিবেদনই তার প্রমাণ।
মূল্য আবার বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংকের ২ থেকে ৩ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI)। বেতন বৃদ্ধির কারণে সেবা খাতেও দাম বাড়ছে।
বেকারত্ব বাড়ছে, একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীত ৭০ দশকের ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর আতঙ্ক ফের জেগে উঠছে।
যদি এই প্রবণতা চলতে থাকে, বন্ধকী ঋণধারী পরিবারগুলো একসঙ্গে দুই আঘাত পাবে: জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে, আর মজুরি বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি ও করেই শেষ হয়ে যাবে। সুদহার কমার আশা কার্যত শেষ।
সরকারের জন্য কঠিন সময়
আগামী মঙ্গলবার রিজার্ভ ব্যাংকের বৈঠকে সুদের হার না বাড়িয়ে, না কমিয়ে, একই জায়গায় রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থনীতিবিদ রিচার্ড হোল্ডেন বলেন, “তারা এক বিপদজনক অবস্থায় আছে। বাড়াতে পারছে না, কমাতেও পারছে না।”
বিরোধী ট্রেজারি মুখপাত্র টেড ও’ব্রায়েন সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়কে দায়ী করছেন, যা তার মতে অর্থনীতির তুলনায় চারগুণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, হোল্ডেন মনে করেন, এর পেছনে সরকার-সমর্থিত উচ্চ মজুরি বৃদ্ধি ও উদার রাজস্ব নীতিও ভূমিকা রাখছে।
তার মতে, রিজার্ভ ব্যাংক আসলে ট্রেজারার জিম চালমার্সের কৌশলই অনুসরণ করছে—অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি ধীরে কমিয়ে কর্মসংস্থান রক্ষা করা।

আগামী বাজেটেই সুযোগ
রাজনৈতিক মেয়াদের শুরুতে থেকেই হোল্ডেন মনে করেন, আগামী মে মাসের বাজেটই হতে পারে সরকারের জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণের একমাত্র বাস্তব সুযোগ।
তবে সরকার বলছে, সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে বিদ্যুৎ বিল সহায়তা শেষ হয়ে যাওয়াও একটি কারণ।
চালমার্স এখন রাজনৈতিক চাপের মুখে, যদিও সেপ্টেম্বরেই তিনি বলেছিলেন এই রিবেট “স্থায়ী নয়”।
সাবেক ট্রেজারি সচিব কেন হেনরি সতর্ক করেছেন, “বারবার রিবেট দিলে বোঝায় নীতিই ভুলভাবে সাজানো।”
ভোটারদের সন্তুষ্ট রাখা
সরকার এখন বেশি খরচ করছে কল্যাণ, বৃদ্ধসেবা, শিশু যত্ন, প্রতিবন্ধী সহায়তা (NDIS), প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে।
ভোটারদের খুশি রাখতে চাইলে শুধু অস্থায়ী সমাধান নয়, টেকসই উদ্যোগ দরকার।
অন্যদিকে, লিবারেল পার্টি নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। জলবায়ু ও জ্বালানি নীতি নিয়ে জনগণের বিরক্তি তারা রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চায়।
শুক্রবার দলীয় বৈঠকে জলবায়ু উদ্যোগে সমর্থন রাখলেও “যেকোনো মূল্যে নয়” বলে একমত হয়েছে এমপিরা।

ভোটারদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
বিল গেটস এই সপ্তাহে লিখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে “অস্তিত্বের সংকট” বলা ভুল, কারণ এতে মানবকল্যাণের দিকটি উপেক্ষিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীও হয়তো সেই দিকেই ঝুঁকছেন। তিনি আগামী সপ্তাহের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আর তার মন্ত্রিসভার অনেকেই আগামী বছর অ্যাডিলেডে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের ধারণায় আগ্রহী নন।
এদিকে টি-শার্ট বিতর্কে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া বিরোধীদের “সংস্কৃতি যুদ্ধের দলে” ফেলে দিচ্ছে—যেখানে সাধারণ মানুষ আসলে জানতে চায় তাদের ঘরে দামের চাপ কতটা বাড়ছে।
মূল প্রতিবেদন- এবিসি নিউজ; অনুবাদ ও সম্পাদনা- ওটিএন বাংলা