দলের আত্মপ্রকাশের দিন হাজারো মানুষ সমাবেশস্থলে জড়ো হয়ে দেখিয়েছিল তাদের প্রতি আগ্রহ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ নভেম্বর- ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট বাংলাদেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ শুধু নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নয়, দেশের পরিচয় এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তার চলে যাওয়ার পর যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, সেখানে ইসলামী রাজনীতির পরিচিত চিহ্নগুলো আবার দৃঢ়ভাবে সামনে আসে। যা আগে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সীমায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রবণতার পেছনে দুইটি কারণ আছে। এক, অনেক মানুষ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরশাসনের সঙ্গে ক্লান্ত। দুই, ভারতের হিন্দুত্ববাদ বা সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদের উত্থান। ভারত যখন নিজেকে হিন্দুত্বের রঙে আবৃত করে, তার ভাবধারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলছে।
শেখ হাসিনার শাসনের সময়, আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্বাধীনতার আদর্শ থেকে ক্ষমতা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তরিত করেছিল। এই সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতা সেন্সরশিপ, রাজনৈতিক প্রাধান্য এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার সঙ্গে যুক্ত হয়। একক ক্ষমতার কারণে ধর্মনিরপেক্ষতার নৈতিক বিশ্বাসও ধ্বংস হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, যারা নৈতিক স্পষ্টতা দেখাতে বা তার ছাপ দিতে পারে, তারা এগিয়ে আসে। ইসলামী দলগুলো, তাদের স্থানীয় কল্যাণমূলক নেটওয়ার্ক এবং অপ্রভাবিত ইমেজ ব্যবহার করে নতুন এক রাজনৈতিক প্রস্তাব রাখে ধর্মকে ন্যায় এবং রাজনীতিকে নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা।
এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তের ওপারের প্রভাব। ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ বা সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ অনেক সময় হিন্দুত্বের এই সাংস্কৃতিক উচ্চতার ভাষা গ্রহণ করে। ভারতীয় নেতারা “হিন্দুরাষ্ট্র” বা “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” নিয়ে মন্তব্য করলে দুই দেশের মধ্যে মানসিক দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। এই উত্তেজনা বাংলাদেশে ইসলামী পরিচয়ের দাবিকে শক্তিশালী করছে।
অনেক তরুণ বাংলাদেশির মনে হয়, যদি প্রতিবেশী দেশ প্রকাশ্যভাবে তাদের ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে মেলাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখবে? এই ধরনের প্রশ্নগুলো মিলিট্যান্ট বা আগ্রাসী নয়, এগুলো পরিচয়ের প্রশ্ন। কিন্তু রাজনৈতিক দলেরা এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল। আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করি যে আমরা কী নই বা আমরা কিসের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের ধর্মশাসিত রাষ্ট্রের বিপক্ষে নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছিল। আজ, একইভাবে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে নিজেদের সংজ্ঞা তৈরি করতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়াও এই চক্রকে তীব্র করছে। হিন্দুত্ববাদী অ্যাকাউন্টগুলো বাংলাদেশে “হিন্দু নিপীড়ন” নিয়ে সংবাদ ছড়ায়। এর জবাবে বাংলাদেশের ইসলামী কণ্ঠগুলো ভারতের মুসলিমদের উপর হামলার ভিডিও শেয়ার করে। প্রতিটি পক্ষই অন্য পক্ষের সন্দেহকে শক্তিশালী করে।
তবে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে দায়মুক্ত করা যায় না। দেশের ইসলামী রাজনীতির উত্থান মূলত অভ্যন্তরীণ অসন্তুষ্টি থেকে এসেছে বেকারত্ব, বৈষম্য, দুর্নীতি এবং শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের অভাব। কিন্তু সীমান্তের ওপারের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। যখন এক সম্প্রদায় ধর্মীয় উচ্চতার দাবি করে, প্রতিবেশীরা নিজেও অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
এক সময় বাংলাদেশ ও ভারত বহুত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল, যেখানে ধর্ম স্বাধীনতার সঙ্গে সহাবস্থান করত। বাংলার ইতিহাসে অনেক সন্ত, কবি ও সংস্কারক হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে একসাথে নিয়ে সংস্কৃতির উন্নতি করেছিলেন। কিন্তু আজ সেই সম্পর্কগুলো ধ্বংস হতে চলেছে, এবং ধর্ম বা জাতীয়তাবাদের প্রতীক দিয়ে নতুন বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের পথ সূক্ষ্ম। এক দল ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতা যেন অন্য এক স্বৈরশাসনের জয় দিতে না পারে। দেশের উচিত ন্যায়, দায়িত্বশীল রাজনীতি এবং ধর্মের প্রতি সম্মান বজায় রেখে সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্নির্মাণ করা।
ভারতের জন্যও সতর্কবার্তা আছে। হিন্দুত্বের জয় ভোট এনে দিতে পারে, কিন্তু এটি অঞ্চলের ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভারতের exclusionary নীতি যত বেশি শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশেও সেই ধরনের রাজনীতি শক্তিশালী হবে। হিন্দু ভারত এবং ইসলামী বাংলাদেশ বিপরীত নয়; তারা একই ধরনের অনিরাপত্তার প্রতিবিম্ব।
দক্ষিণ এশিয়ায় আরেকটি বিভাজন দরকার নেই। উভয় দেশের উচিত বোঝা যে ধর্ম নাগরিকত্বের ভিত্তি হতে পারে না এবং গর্ব বহুত্ববাদকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। যতক্ষণ এই শিক্ষা শিখবে না, চাঁদ ও সাফফ্রনের মধ্যে উত্তেজনা চলতে থাকবে, যা উভয় দেশের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।
সুত্রঃ The Jakarta Post