বোয়িং কেনার ঘোষণা আসার পর এবার এয়ারবাস বিক্রির জন্য ইউরোপের কূটনীতিকদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৭ নভেম্বর- বোয়িং কেনার ঘোষণা আসার পর এবার এয়ারবাস বিক্রির জন্য ইউরোপের কূটনীতিকদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত সরকার জুলাই মাসে প্রকাশ করার পর থেকেই ইউরোপের প্রতিনিধিরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নভেম্বরে তারা আরও জোরালোভাবে বিষয়টি সামনে আনেন। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সরাসরি এয়ারবাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। চাপের বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকলেও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলছেন, সরকারের ওপর কোনও চাপ নেই।
জুলাই মাসে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত বছরও বোয়িং কেনার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ওই সময়ের বিমানমন্ত্রী ফারুক খানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বৈঠকের পর বিমান মন্ত্রণালয় জানায়, বোয়িং না এয়ারবাস, কোন উড়োজাহাজ কেনা হবে, তা নির্ভর করবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ওপর। তবে কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আগস্টের পর সেই মূল্যায়ন প্রতিবেদন আর হাতে পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পর দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা আবারও সামনে আসে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িং কেনার ঘোষণা দেয়।
এই ঘোষণার তিন মাস পর, ৪ নভেম্বর ঢাকায় ‘বাংলাদেশের এভিয়েশন গ্রোথ’ শীর্ষক একটি আলোচনায় এয়ারবাসের পক্ষে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা সরব হন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ মার্স সেরে শার্লে, জার্মানির রাষ্ট্রদূত রুডিগার লটজ এবং এয়ারবাসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাফায়েল গোমেজ। সেখানে বক্তারা উড়োজাহাজ খাতে সবার জন্য সমান সুযোগ ও স্বচ্ছতার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের বিমান বহর আধুনিকীকরণের পরিকল্পনায় এয়ারবাসকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বোয়িং ২৫টি উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে আর এয়ারবাস দিয়েছে ১৪টি। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের আলোচনা এখানেই থামেনি। তারা সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার সঙ্গে একাধিক বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মার্ক সেরে শার্লে ২৫ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এয়ারবাসের প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। যদিও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এয়ারবাসের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়নি।
একই সময়, ২৬ নভেম্বর প্রেস ক্লাবে ডিক্যাব টকে জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লটজ বলেন, এয়ারবাস নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, জিএসপি প্লাস সংক্রান্ত আলোচনা এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের কিছু অংশ এ ধরনের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তবে তিনি এটিকে কোনও ধরনের চাপ বা হুমকি হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই বলেও জানান।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, একটি বাণিজ্যিক চুক্তির কারণে সার্বিক সম্পর্ক প্রভাবিত হবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি মনে করেন, প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রদূতই তাদের দেশের পণ্য বিক্রি করতে চেষ্টা করেন এবং এটি তাদের দায়িত্বের অংশ। বাংলাদেশের কোনটি সুবিধাজনক হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকারই নেবে।
প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি ইউরোপের প্রস্তাব গ্রহণ করবে, নাকি ফিরিয়ে দেবে। ঢাকার একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, শুধুমাত্র কূটনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিলে তা আত্মঘাতী হতে পারে। সক্ষমতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এভিয়েশন খাতে এয়ারবাস বাংলাদেশের জন্য নতুন, তাই চাপ নয়, বাস্তব সক্ষমতাই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন