আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২৭ নভেম্বর- ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানজুড়ে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণবিপ্লব শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের ওপর বৈষম্য সেই আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছিল। নেতৃত্বের ব্যর্থতায় এই বিপ্লব রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। কত মানুষ নিহত হয়েছিল তার নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। ধারণা করা হয় তিন লাখ থেকে শুরু করে প্রায় ত্রিশ লাখ পর্যন্ত।
এই সময় অসংখ্য বাঙালি প্রাণ দিয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা প্রায়ই আড়ালে রয়ে গেছে। কিন্তু নারীর ত্যাগ, সাহস, সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য।
নারীর ওপর নির্মম নির্যাতন
পাকিস্তানি বাহিনী নারীদের ওপর যে অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল তার বিবরণ নথিভুক্ত রয়েছে। ইয়াসমিন সাইকিয়ার গবেষণা থেকে জানা যায়, নারীদের ঘরে ঢুকে পরিবারের সামনে বিবস্ত্র করা, গণধর্ষণ, আটক রেখে নির্যাতন, খাদ্য-বঞ্চনা, চুল কেটে ফেলা, বারবার যৌন সহিংসতা চালানোসহ অকথ্য নির্যাতনের শিকার করা হয়েছিল। অনেকে ক্ষুধায়, আঘাতে ও মানসিক অশান্তিতে মারা যান।
নূর বেগম নামের এক নারী জানান, তাঁর মুক্তিযোদ্ধা স্বামীকে সামনে হত্যা করা হয়, এরপর তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়, হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। বয়স ১৪ থেকে ২২ বছরের অগণিত মেয়ের ওপর একই বর্বরতা নেমে এসেছিল। ঠিক কত নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তা জানা যায় না। অনুমান মতে কয়েক লক্ষ। তখনকার চিকিৎসক ড. সৈয়দ আহমেদ নূরজাহান জানান, এক দিনে তিনি দুই শতাধিক ধর্ষিত নারীকে গর্ভপাত করান।
এই সহিংসতা ছিল পরিকল্পিত। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর, আলশামস নারীর শরীরকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল বাঙালিদের ভীত করতে ও অপমানিত করতে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নারীর দমন
উপমহাদেশে নারীর প্রতি বৈষম্য বহু পুরোনো। সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থা, সম্পত্তিকে পুরুষের উত্তরাধিকারের মাধ্যমে সংরক্ষণ, বাল্যবিবাহ, পর্দা প্রথা সব মিলিয়ে নারীকে সম্পত্তি মনে করা হতো। এর ওপর ব্রিটিশ শাসনের ‘ভাগ করে শাসন’ নীতি, দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নারীর অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তোলে। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গায় লক্ষাধিক নারী অপহৃত, ধর্ষিত ও নির্যাতিত হয়েছিলেন।
পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের ওপর বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, বাঙালি ও পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব ভেসে ওঠে ৬০ দশকে। এই রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধে নারীর দৃঢ় ভূমিকা
নির্যাতনের আশঙ্কা জেনেও হাজার হাজার নারী যুদ্ধে যুক্ত হন। তাঁরা গুপ্তচরবৃত্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও তথ্য সরবরাহ, আহতদের সেবা, ঘরকে অস্থায়ী হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার এবং অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ নেন।
কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী শিরিন বানু মিতিল বলেন, নারীরা রাস্তায় গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাদ্য ও তথ্য দিয়েছেন। প্রতিটি ঘর হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের কেন্দ্র।
গর্ভবতী রয়েকা বেগম রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিতেন, ঘরের পাশে কুয়ার ভেতর অস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন।
লায়লা আহমেদ, একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী, বাবাকে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করলে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে জিনিসপত্র বিক্রি করে ভারতের গোবরা ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখানে ২৩৪ নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাঁরা অস্ত্র প্রশিক্ষণ, ফার্স্ট এড, গুপ্তচরবৃত্তি, রাজনৈতিক শিক্ষা সব শিখতেন। ক্যাম্পে বিপ্লবী রাজনীতি, ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার গল্প তাঁদের অনুপ্রাণিত করত।
অনেকের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিপ্লবের সময় নারী-পুরুষের ভেদাভেদ মুছে গিয়েছিল। সবাই একই লক্ষ্যে এক হয়ে লড়েছিলেন।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ এবং নারীর বঞ্চনা
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি দ্রুতই দমননীতিতে বদলে যায়। বহু বামপন্থী কর্মী নিপীড়িত হন। নারীরাও বঞ্চনার শিকার হন। ‘বীরাঙ্গনা’ কর্মসূচি নিয়ে অনেকে এগিয়ে এলে সমাজ তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। অনেককে পরিবার ত্যাগ করে। সরকার পুরুষদের চাকরির লোভ দেখিয়ে এসব নারীকে বিয়ে করিয়েছে, পরে অনেকে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সুবিধা নিয়ে চলে যায়।
এক নারী জানান, ১২ বছর বয়সে ধর্ষণের পর গর্ভবতী হন। সাত মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে গর্ভপাত করানো হয়। পরিবার লোকলজ্জায় ভেঙে পড়ে। তিনি কোনো আর্থিক সহায়তাও পাননি।
সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ নূর বেগমের। তিনি বীরাঙ্গনা হয়েও কোনো স্বীকৃতি পাননি। প্রতারিত হয়ে বিয়ে, স্বামীর সরকারি চাকরি, তারপর তালাক, একাকিত্ব সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের আক্ষেপ ছিল তীব্র।
কেন নারীর মুক্তি অসম্পূর্ণ রয়ে গেল
স্বাধীনতার পর নতুন প্রভাবশালী শ্রেণির উত্থান ঘটে, যারা সাম্য বা নারীর মুক্তিতে আগ্রহী ছিল না। সামরিক শাসন, ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজন, নারীর অধিকার সংকোচন সব মিলিয়ে নারীর অবস্থার উন্নতি হয়নি।
নারীরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল, নিজের শক্তির পরিচয় পেয়েছিল। কিন্তু সমাজ তাদের সেই জায়গায় থাকতে দেয়নি।
বর্তমানের চিত্র
বাংলাদেশ নারী-শ্রমের ওপর দাঁড়ানো একটি অর্থনৈতিক কাঠামো ধারণ করে। গার্মেন্টসে কর্মরত ৮০ শতাংশই নারী, যাদের আয় কম, কাজের পরিবেশ কঠিন। যৌন হয়রানির হারও অত্যন্ত বেশি। নারী প্রধানমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও নারীর বাস্তব জীবনে পরিবর্তন খুব কম।
অনেক নারীর মতে, মুক্তিযুদ্ধ ধনী ও গরিবের কাছে আলাদা অভিজ্ঞতা ছিল। গরিব নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, সবচেয়ে বেশি ত্যাগ করেন, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল কম পান।
১৯৬৮ থেকে ১৯৭৫ সালের বিপ্লব ও মুক্তিযুদ্ধ নারীদের নতুন করে চিনিয়েছিল তাদের শক্তি ও অধিকার। তারা জীবন বাজি রেখে দেশকে রক্ষা করেছে। কিন্তু যুদ্ধের পর তাদের অধিকারের লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা ও অর্থনৈতিক শোষণ আজও রয়ে গেছে।
নারীরা মুক্তিযুদ্ধের অজেয় শক্তি ছিলেন। তাদের ত্যাগ স্বাধীনতার ভিত্তি গড়েছে। কিন্তু প্রকৃত মুক্তি পেতে এখনো অনেক পথ বাকি।
সূত্রঃ Marxism
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au