চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৪ ডিসেম্বর- লক্ষ্মীপুরের ইতিহাসে ৪ ডিসেম্বর এক গৌরবময় ও আবেগভরা দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের টানা অভিযান আর চাপ সহ্য করতে না পেরে রাতের অন্ধকারে কৌশলে পালিয়ে যায়। পরদিন সকালে মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই লক্ষ্মীপুর সদরের মানুষ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। দীর্ঘ নয় মাসের দখলদারিত্বের অবসান ঘটে।
শুরুর প্রতিরোধ ও কৌশলগত সাফল্য
লক্ষ্মীপুরে পাকিস্তানবিরোধী প্রতিরোধ শুরু হয় এপ্রিলেই। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ’ অনুযায়ী, শত্রু যাতে সহজে সদর এলাকায় ঢুকতে না পারে, সে জন্য চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর সদর পর্যন্ত প্রধান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ব্রিজ ভেঙে দেয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় স্বাধীনতাকামী মানুষ। মাদাম ব্রিজ, মন্দারী বাজার ব্রিজ ও চন্দ্রগঞ্জ পশ্চিম বাজার ব্রিজ ভেঙে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানি বাহিনীকে অগ্রযাত্রায় বিপাকে ফেলে। এখনও মাদাম ব্রিজের ভাঙা পিলার সেই স্মৃতি ধরে রেখেছে।
দখল, গণহত্যা ও সাব ক্যাম্প
২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা লক্ষ্মীপুর সদরে ঢোকার পর বাজারডিতে সার্কেল অফিসারের কার্যালয়কে প্রধান ক্যাম্প বানায়। একই দিন মজপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে ৩৫ জনকে হত্যা করে। এই ঘটনা ইতিহাসে ‘মজপুর গণহত্যা’ নামে পরিচিত। পরে তারা দালাল বাজার হাইস্কুল, মান্দারী হাইস্কুল, বটু চৌধুরীর বাড়ি, পুরাতন হাইস্কুল, বড় মসজিদ, পেয়ারাপুর, আলমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সাব ক্যাম্প গড়ে তোলে।
লক্ষ্মীপুরের সম্মুখযুদ্ধ
মুক্তিযোদ্ধারা এখানকার প্রতিটি এলাকায় আক্রমণাত্মক ও সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, শুধু এই জেলায়ই ১৭টি বড় সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দালাল বাজার রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন, মান্দারী ক্যাম্প আক্রমণ, প্রতাপগঞ্জ হাইস্কুল আক্রমণ ও বড়ালিয়া অপারেশন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
পাকিস্তানি বাহিনীর পলায়ন
নভেম্বরের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ আরও তীব্র হয়। সেই সময়ের স্মৃতিচারণায় মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম ও খোরশেদ আলম পাটোয়ারী জানান, পাকিস্তানি বাহিনী তখন ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল। তাদের চলাচল সীমিত হয়ে আসে। ২ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা রফিকুল হায়দার চৌধুরী, আক্তারুজ্জামান ও সুবেদার আবদুল মতিনের নেতৃত্বে মাদাম ও থানার দুই ক্যাম্প ঘিরে ফেলেন। ৩ ডিসেম্বর ভোরে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলে পাকিস্তানি সেনারা তা প্রত্যাখ্যান করে। শুরু হয় টানা লড়াই।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা গুলিবর্ষণ, মর্টার হামলা, আর দিগন্তজোড়া ধোঁয়া তখন লক্ষ্মীপুরের আকাশ ঢেকে ফেলেছিল।
সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ
বিকেলের দিকে এক অনন্য দৃশ্য দেখা যায়। হাজারো মানুষ হাতে লাঠি, বাঁশ, কাস্তে, দা যা পেয়েছেন তা নিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে রাস্তায় নেমে আসেন। মনে হচ্ছিল আর কোনো শক্তিই বিজয় ঠেকাতে পারবে না।
বিজয়ের সকাল
৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকারদের রেখে পালিয়ে যায় চৌমুহনীর দিকে। ৪ ডিসেম্বর সকালে খবর ছড়িয়ে পড়তেই শহরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মানুষের চোখে সেইদিন ছিল স্বাধীনতার প্রথম আলো।
বিজয়ের সাথে বেদনার গল্প
বিজয়ের উৎসবের মধ্যেও ঘটে এক বেদনাদায়ক ঘটনা। রাজাকার কমান্ডার আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিত হামলা হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ শহীদ হন, আহত হন আরও তিনজন।
এভাবেই যুদ্ধ, ত্যাগ, আনন্দ আর বেদনার মিশেলে লেখা হয় লক্ষ্মীপুর মুক্ত হওয়ার ইতিহাস।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au