ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ ডিসেম্বর- রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী হয় না; বরং তা হয় সবচেয়ে অনিশ্চিত ও প্রান্তিক অবস্থানে থাকা শক্তির। বাংলাদেশে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্য, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর উসকানিমূলক মন্তব্য, সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। জাতীয়তাবাদী দাম্ভিকতা ও ইতিহাস বিকৃতির মোড়কে এসব বক্তব্যকে প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে তা রাজনৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের বিরুদ্ধে হুমকির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা ইসলামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের কিছু সহানুভূতিশীল মহল ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে বিকৃত করার নতুন চেষ্টা শুরু করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দাবি হলো, মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নয়, বরং ভারতকে দায়ী করার প্রচেষ্টা।

হাদির মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় রাতভর বিক্ষোভ, অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
ইতিহাসবিদদের কাছে ১৯৭১ সালের ঘটনা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ১৪ ডিসেম্বর শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সংস্কৃতিকর্মীদের টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী আল বদর ও আল শামস বাহিনী। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। ওই যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল প্রকাশ্য এবং স্পষ্ট। গণহত্যা ও শরণার্থী স্রোতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ভারত সরাসরি সহায়তায় এগিয়ে আসে। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ভারতের ওপর দায় চাপানো ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা নয়, বরং রাজনৈতিক দায়মুক্তির চেষ্টা বলেই মনে করছেন গবেষকেরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো বক্তব্য ও বাস্তবতার ফারাক। জোরালো ভাষা ব্যবহার করলেও এনসিপির জনসমর্থন বাড়ছে না। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দলটির সম্ভাব্য ভোটভিত্তি প্রায় ৪ শতাংশ থেকে নেমে ০ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখনও পরিবর্তনশীল হলেও এনসিপি বড় কোনো শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠিত দলগুলোই এখনো জনমনে প্রাধান্য পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই বক্তব্যের তীব্রতার ব্যাখ্যা মেলে। রাজনৈতিক বৈধতা দুর্বল হলে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও উসকানি সহজ পথ হয়ে ওঠে। সংগঠন, তৃণমূল শক্তি বা বাস্তবসম্মত শাসন পরিকল্পনা না থাকলে প্রতিবেশী দেশকে হুমকি দেওয়া কিংবা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে আবেগ উসকে দেওয়াই হয়ে ওঠে আলোচনায় থাকার কৌশল।
তবে ভারতের জন্য এসব বক্তব্যকে সরাসরি কৌশলগত হুমকি হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মত দিচ্ছেন কূটনীতি বিশ্লেষকেরা। বরং অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখালে সেই উগ্র শক্তিগুলোর উদ্দেশ্যই পূরণ হবে। কড়া ভাষা বা প্রকাশ্য পাল্টা হুমকি ভারতের ওপর প্রভাবশালী প্রতিবেশীর তকমা বসানোর সুযোগ করে দেবে, যা এই গোষ্ঠীগুলোই চায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জন্য কার্যকর পথ হলো সংযম ও আত্মবিশ্বাস। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যোগাযোগ বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্প এবং মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদার করাই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাণিজ্য করিডর, জ্বালানি সহযোগিতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কূটনৈতিক বিবৃতির চেয়েও বেশি কার্যকর বার্তা দেয়।
একই সঙ্গে ইতিহাসের সত্যতা রক্ষায় নীরব কিন্তু দৃঢ় উদ্যোগ জরুরি। যৌথ গবেষণা, আর্কাইভ সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রকল্প ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত প্রতিরোধ। তথ্য ও প্রমাণ সামনে থাকলে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য টিকতে পারে না।
দক্ষিণ এশিয়ায় বারবার দেখা গেছে, প্রান্তিক উগ্র গোষ্ঠীগুলো উসকানির মাধ্যমে গুরুত্ব পেতে চায়। তাদের সেই গুরুত্ব না দিয়ে সংযমী অবস্থান নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। সাম্প্রতিক জরিপও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের ভোটাররা প্রতিবেশীকে হুমকি দেওয়ার রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও আইনের শাসনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সবশেষে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সামনে পছন্দের প্রশ্ন শক্তি না সংযমের নয়, বরং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে নির্বাচন করার। ইতিহাস, সত্য ও ধারাবাহিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সংযত কৌশল গ্রহণ করলে উগ্রবাদী বক্তব্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেই শক্তি হারাবে। জরিপ যেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে, আওয়াজ যতই বড় হোক, সমর্থনের ভিত ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
সূত্রঃ ফাস্ট পোস্ট