বাংলাদেশ

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কণ্ঠ শুনুন- শুনতেই হবে-সম্পাদকীয়

  • 2:38 pm - December 22, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৫০ বার
দীপু চন্দ্র দাস

মেলবোর্ন ২২ ডিসেম্বর: ভালুকার এক যুবক দিপু চন্দ্র দাস, বয়স ২৭ বছর, পেশায় একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় কর্মস্থল-সংক্রান্ত একটি বিরোধের জেরে তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দীপু চন্দ্র দাস পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, ‘তৌহিদি জনতা’ নামধারী একটি দল তাকে পুলিশের কাছ থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ ঘটনায় ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনও প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব। 

আগেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও হিন্দু পল্লীতে হামলা, ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা, ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু বসতিতে হামলা, রংপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ভোলায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২১ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের ওপর হামলা এবং সহিংসতার ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। যার ‘কথিত ফেসবুক পোস্ট’ নিয়ে রংপুরে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, আগুন আর লুটপাট করা হয়েছে, সেই টিটু রায় লেখা-পড়াই জানে না। খুলনার এক মাওলানার ফেসবুক থেকে স্ট্যাটাসটি ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালে খুলনায় এক কিশোরের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ ওঠে। খুলনা মেট্রোপিলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের দপ্তরে নেওয়া হলে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতিতেই গণপিটুনি দেওয়া হয় তাকে। এ বছরের জুলাইতে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকাজুড়ে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। সেখানকার একটি এলাকা থেকে একদল ব্যক্তি মাইকে ঘোষণা দিয়ে মিছিল নিয়ে এসে হামলা ও ভাঙচুর করেছে বলে জানান প্রশাসন ও স্থানীয়রা।

এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এগুলো এক দীর্ঘ, গভীরভাবে উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতার অংশ। প্রতিবারই নতুন করে অভিযোগ ওঠে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা ও সহিংসতা, আর শেষ পর্যন্ত শোনা যায় সেই পরিচিত বাক্য ‘প্রমাণ মেলেনি’। কিন্তু প্রমাণের অনুপস্থিতি ক্ষতকে মুছে দেয় না। প্রতিটি ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হয় মানুষের জীবন,আর চিরতরে নড়ে যায় নিরাপত্তাবোধের ভিত- যার ক্ষতচিহ্ন প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলে।

প্রশ্ন জাগে এই ক্ষতির দায় কার, আর বিচার কোথায়?

এই বিপুল ক্ষতির দায় কার, আর বিচারই বা কোথায়? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, বাংলাদেশের সংবিধান, নাগরিকের সমতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের সমতা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচরিত্রকে স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছে। সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করতে পারবে না। কাজ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সংবিধান অসাম্প্রদায়িকতার নীতিকে সমানভাবে প্রযোজ্য করেছে। সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা কোনো পদ লাভের অযোগ্য বিবেচিত হবেন না এবং সেই ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। ফলে এটি পরিষ্কার যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনার মূল দর্শন, সংবিধান এবং আইন-সবই ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শকে সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ বাস্তবতার আরেকটি চিত্র তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “ বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।” প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভূমি দখলের ক্ষেত্রে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিতভাবে আক্রমণের শিকার হন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। জমি দখল, হুমকি, পরিকল্পিত গুজব ও আকস্মিক হামলা-এই পরিচিত বৃত্ত থেকে তারা বেরোতে পারছে না। জন্মের পর থেকেই একজন হিন্দু শিশু বড় হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য ভয়ের আবহে। স্কুলে সহপাঠীদের কাছ থেকে তাকে সহ্য করতে হয় অব্যক্ত বিদ্বেষ ও নির্মম বুলিং। বড় হয়ে অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অনেক সময়ই চলতে হয় মাথা নিচু করে-নিজেকে আড়াল করে, পরিচয় লুকিয়ে, নিরাপদ থাকার এক নীরব কৌশল রপ্ত করে। এই নীরবতাই বলে দেয়, সংবিধানের প্রতিশ্রুতি আর জীবনের বাস্তবতার মধ্যে কতটা গভীর ফাঁক রয়ে গেছে।

এই ভয়ের সংস্কৃতি কেবল আজকের নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে ঢাল করে গণপিটুনি- এগুলো বছরের পর বছর ঘুরে ফিরে এসেছে। আর প্রতিবারই বিচারহীনতার অনুভূতি আরও গাঢ় হয়েছে। বিচার না হলে নির্যাতন থামে না এই সহজ সত্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, প্রশাসন কেউ মানতে চান না?

হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আজ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। চোখে ঘুম নেই। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, ঘর ছাড়ার কথা ভাবা, দেশান্তরী হয়ে যাওয়া এসব তাদের নিত্যসঙ্গী। কেউ কেউ দেশ ছাড়তে চান,  কেউ পারেন, কেউ পারেন না। কেউ নীরব থাকেন নীরবে সব অন্যায় সহ্য করে। কারণ কথা বললেই বিপদ। কথা বললেই নিজের বা পরিবারের ওপর দিপু দাস এর মত নির্যাতন নেমে আসতে পারে। এই আশঙ্কা এখন সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এই নীরবতা সম্মতি নয়; ভয় থেকে।

গবেষণা বলে, যারা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তারাই সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারে, আস্থা গড়ে তোলে এবং সিদ্ধান্তে ভুলের সম্ভাবনা কমায়। এই প্রেক্ষাপটে স্টিফেন কোভির একটি উক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, মানুষ সাধারণত বোঝার জন্য শোনে না; তারা শোনে উত্তর দেওয়ার জন্য। অথচ প্রকৃত শোনা মানে শুধু শব্দ শোনা নয়, ভেতরের কান দিয়ে শোনা- যেখানে নিজের অবস্থান, পূর্বধারণা এবং অজ্ঞতাকে প্রশ্ন করার সাহস থাকে। প্রয়াত রাব্বি জোনাথন স্যাক্স স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অন্যের প্রতি সত্যিকারের উন্মুক্ত থাকা মানে তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা, তাকে নির্ভয়ে সত্য বলার সুযোগ দেওয়া। এমনকি যদি সেই সত্য আমাদের নিজেদের দুর্বলতাও প্রকাশ করে দেয়। এই মানসিকতাই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি কাজটি হলো আমাদের কথা শোনা। শোনা মানে বক্তব্য দেওয়া নয়, ব্যাখ্যা দাঁড় করানো নয়, দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোও নয়। শোনা মানে যাদের ওপর আঘাত আসছে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ, তাদের অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করা; তাদের ভয়কে তুচ্ছ না করা; তাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শোনা মানে- নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করা, জানা না থাকলে জানার চেষ্টা করা।

রাজনীতি থাকবে, মতভেদ থাকবে, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে যদি আমরা একতার পথে হাঁটতে চাই, তবে আগে থামতে হবে তারপর আমাদের কথা শুনতে হবে। দীপু চন্দ্র দাসের মৃত্যু, শাল্লা, রামু, নাসিরনগর, কুমিল্লা, রংপুর, গঙ্গাচড়া এই নামগুলো কেবল ঘটনার তালিকা নয়; এগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনের ভাঙচুরের মানচিত্র। অস্তিত্বের মানচিত্র। 

তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে মানবিক দায়িত্ব হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের কণ্ঠ মন দিয়ে শোনা। তাদের কথার প্রতিরোধ নয়, প্রতিক্রিয়া নয়, ব্যাখ্যার দোহাই নয়; বরং সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে শোনা।

নতশিরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রশাসন এবং যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন যদি কিছু সময় নীরব থাকতে পারে, যদি ক্ষতবিক্ষত মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রশ্ন না করে বিশ্বাস করতে পারে, তাহলেই হয়তো একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পথে এক ধাপ এগোনো সম্ভব হবে।
আজ কথা বলার চেয়ে কথা শোনাই হবে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক নেতা তথা প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
 ড. প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন
সম্পাদক, ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি

মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…

ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে গোপন সম্পদ? প্রশ্নের মুখে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতি,…

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ: বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার অমর দিকনির্দেশনা

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ দিনটি এক অনন্য, অবিস্মরণীয় এবং গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই…

ট্রাম্পের যুদ্ধ, বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল ও বিশ্বের সম্পর্কের মানচিত্র

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব…

যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে মার্কিন স্টেলথ বোমারু বিমান

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ বোমারু বিমান যুক্তরাজ্যের দিকে রওনা হয়েছে বলে…

খুলনায় জমি দখলে হিন্দু পরিবারের ওপর নির্মম হামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- খুলনার দৌলতপুর এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এক হিন্দু পরিবারের ওপর হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারটি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au