মতামত

মতামত: বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন কীভাবে ইউনূস সরকারের নির্বাচনী কৌশলে পরিণত হয়েছে?

  • 10:52 pm - December 27, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৩১২ বার
গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির জানাজায় শোক জানাতে দেখা যায় মুহাম্মদ ইউনূসকে। হাদির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ ও হিন্দুবিরোধী দাঙ্গা আরও তীব্র হয়েছে। ছবি: রয়টার্স (ফাইল)

মেলবোর্ন ২৭ ডিসেম্বর: বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর চলমান নির্যাতন কেবল একটি মানবাধিকার সংকট নয়; এটি অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের নির্বাচনী রাজনীতির একটি সচেতন উপাদানে পরিণত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামি, তাদের সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং উগ্র ছাত্র সংগঠনগুলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও নির্বাচনী সাফল্যের সোপান হিসেবে। জনগণের সামনে তাদের আর কোনো কর্মসূচি নেই, আছে কেবল ধর্ম। ফলে ধর্মীয় মেরুকরণই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান ভোটরাজনীতি।

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন উগ্রবাদী রাজনীতির গভীর পচনের প্রতিফলন। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ভারতবিরোধী বক্তব্য মিলিয়ে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। তথাকথিত ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব ও পরিবর্তনের স্লোগান ছিল কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জা। বাস্তবে এটি ছিল বাংলাদেশকে ভারতের উত্থানের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী কাঁটা বানানোর সুপরিকল্পিত প্রয়াস।

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ময়মনসিংহে হিন্দু পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্যে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এই বাস্তবতার নগ্ন প্রকাশ। ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগকে ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ডকে ‘ন্যায্যতা’ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ধর্মীয় সংহতি ও ভারতবিরোধী উত্তেজনা উসকে দেওয়ার রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়। এই কৌশলই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনের চরিত্র নির্ধারণ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক শোক আর নিন্দা ছিল কেবল লোক দেখানো, তাদের আসল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য গোপন করার একটি উপায়।

ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে সামনে এনে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শাসনব্যবস্থার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে ইউনূস সরকারের অধীনে দেশ কার্যত এক গভীর দুর্দশায় পড়েছে। তবুও জামায়াত ও তাদের মিত্ররা কেবল ধর্মীয় আবেগ উসকে দিয়েই ভোটের রাজনীতি করতে চাইছে।

১১ ডিসেম্বর ২০২৫ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভোটগ্রহণের দিন ধার্য হয়। একই সঙ্গে ‘জুলাই চার্টার’ নামে একটি গণভোটের ঘোষণা দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন, যা নতুন হলেও এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।

কিন্তু গোটা প্রক্রিয়াই এক প্রহসন বলে। নির্বাচন যেন আগে থেকেই নির্ধারিত একটি ‘ফিক্সড ম্যাচ’। হিন্দু যুবকের গণপিটুনি ও হত্যাই প্রমাণ করে, কীভাবে ভয় ও সহিংসতার আবহে এই ভোটের মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। আরও বহু হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্তই হয় না, কারণ সংবাদমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত।

বর্তমান রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামি কার্যত প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এনসিপি, যা শেখ হাসিনাকে উৎখাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, এখন গুরুত্বহীন। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। আদর্শ, উগ্রতা ও ধর্ম মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তুলেছে।

এই অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব থাকা মানেই একটি অস্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। তিনি ইতোমধ্যে বন্দিদের মুক্তি, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মতো আচরণ করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।

হিন্দু সংখ্যালঘুরা এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। তাদের প্রতিদিনের জীবন ভয়ে আচ্ছন্ন, বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে। হিন্দুদের ‘ভারতের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা তাদের আরও টার্গেটে পরিণত করছে।

নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের জোটই এখন সবচেয়ে সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। অতীতে বিএনপি ইসলামপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেছে। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও উগ্রবাদ দমন হবে না। বরং জামায়াত এবার সামনের সারিতে থাকবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ফলে প্রকৃত বিরোধী শক্তি অনুপস্থিত থাকবে।

যদি বিএনপি শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ায়, জামায়াত এককভাবে ক্ষমতায় যাবে। তখন বাংলাদেশ কার্যত উগ্রবাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আবার এক ধরনের পূর্ব পাকিস্তানি বাস্তবতায় ফিরে যেতে পারে।

শেখ হাসিনার শাসন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক স্থিতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এনেছিলেন। সেই অর্জনগুলো ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপর্যয়ে’ ধ্বংস হয়ে গেছে। তথাকথিত নতুন প্রজাতন্ত্র এখন পরিণত হয়েছে মিথ্যা, বিশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় পতনের প্রতীকে।

আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য আরও অস্থির ও বিপজ্জনক হতে চলেছে। জামায়াত ইতিমধ্যে প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিচারব্যবস্থায় নিজেদের লোক বসিয়ে একচ্ছত্র প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছে জামায়াতের পক্ষে। এই পচন দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে রাষ্ট্রের সব স্তরে।

লেখক:

জাজতি কে পাত্নায়েক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর ওয়েস্ট এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক।
চন্দন কে পাণ্ডা, সহকারী অধ্যাপক রাজীব গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়।

এই শাখার আরও খবর

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ঝরল ১০ প্রাণ, আহত আরও ২০

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: নাটোরের বড়াইগ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন।…

‘আমি ভয় পাই না’, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা আবারও বললেন শেখ হাসিনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au