বাংলাদেশ

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

  • 5:21 am - September 05, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ ও পৃষ্ঠের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ ও পৃষ্ঠের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকা নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।

উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি পান, গোসল, কাপড় ধোয়া, রান্না ও গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন। ফলে যেসব এলাকায় নিরাপদ পানির উৎস সীমিত, সেখানে পানির লবণাক্ততা শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, ক্রমেই তা জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লবণাক্ত পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়ামের উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ লবণাক্ততার পানি পান উচ্চ রক্তচাপ ও গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় নদী ও খালগুলোতে লবণাক্ত পানি প্রবেশের প্রবণতা বাড়ছে। নদীর মাধ্যমে সেই লবণাক্ত পানি আরও ভেতরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বাঁধ ভেঙে বা উপচে পড়া সমুদ্রের পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ায় অনেক এলাকায় ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

লবণাক্ততার কারণে কৃষকেরাও অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ফসল চাষ থেকে সরে গিয়ে চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন। এতে একদিকে কৃষিজমির ব্যবহার বদলে যাচ্ছে, অন্যদিকে মাটির লবণাক্ততা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সমুদ্রের পানি একবার কৃষিজমিতে প্রবেশ করলে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেই জমিতে স্বাভাবিকভাবে ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে খাদ্য উৎপাদন, জীবিকা ও নিরাপদ পানির সংকট পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নারী। উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারী পরিবারের দৈনন্দিন কাজের বড় অংশ সামলান। তাঁদের কাপড় ধোয়া, শিশুদের গোসল করানো, ঘর পরিষ্কার করা এবং রান্নার কাজে নিয়মিত পানির সংস্পর্শে থাকতে হয়। নিরাপদ পানির অভাবে এসব কাজেও লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হয়। ফলে তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকছেন।

লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অপর্যাপ্ত পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব নারী দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে প্রজনননালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেওয়ার কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকোচ রয়েছে। ফলে লবণাক্ততার কারণে নারীদের কী ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা হচ্ছে, কতজন চিকিৎসা নিচ্ছেন, কতজন অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হচ্ছেন কিংবা এসব সমস্যার কারণে কতজনের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না।

শ্যামনগরের একটি হাসপাতালকে ঘিরে করা পর্যবেক্ষণে এমন দাবি উঠে এসেছে যে, সেখানে সম্পন্ন হওয়া অস্ত্রোপচারের প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীদের জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে। তবে এ ধরনের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে রোগীদের স্বাস্থ্যগত কারণ, চিকিৎসাগত প্রয়োজন এবং লবণাক্ততার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তারপরও উপকূলীয় নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।

জলবায়ু নীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু অগ্রগতি হলেও উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকিতে থাকা নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে উদ্বেগ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু অর্থনীতি বা পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের স্বাস্থ্য, বিশেষ করে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

এ কারণে জলবায়ু নীতি তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব নারী প্রতিদিন লবণাক্ত পানির সঙ্গে বসবাস করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানো জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা সহজ হতে পারে।

লবণাক্ততা মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানো, নিরাপদ পানির উৎস তৈরি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি শোধন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জলাধার ও নদীগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব। লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় নারীদের কী ধরনের রোগ হচ্ছে, কতজন চিকিৎসা নিচ্ছেন, কতজন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন কিংবা কতজন অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হচ্ছেন, সে বিষয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এসব তথ্য ভবিষ্যতে জাতীয় জলবায়ু নীতি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না, সেই প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত করাও জরুরি। উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নারী ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, প্রজননস্বাস্থ্যসেবা, সংক্রমণ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের লবণাক্ততা-সম্পর্কিত সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা এখন আর কেবল পরিবেশগত সংকট নয়। এটি নিরাপদ পানীয় জল, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই লবণাক্ততার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারীদের অভিজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে জলবায়ু নীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনতে হবে। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, উন্নত স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে উপকূলীয় মানুষের ওপর লবণাক্ততার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পানির লবণাক্ততা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।

সূত্রঃ Next Century Foundation

এই শাখার আরও খবর

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানালেন ৩ উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।…

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যুদ্ধ, বাণিজ্যিক অস্থিরতা এবং সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে,…

চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনলে বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধা কী?

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীন থেকে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। আলোচনায় থাকা চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান নিয়ে ইতোমধ্যে দেশের প্রতিরক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au