আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২ ডিসেম্বর- বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক মানবাধিকার সংগঠন। পিটিয়ে হত্যা, হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা বছরজুড়েই ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসের হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যা সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর মব তৈরি করে হামলার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিসহ অন্তত তিনটি সংগঠনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালজুড়ে মব সহিংসতা একটি নিয়মিত ও ভয়াবহ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। যদিও নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে সংগঠনগুলোর তথ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে, তবুও সবাই একমত যে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বছরজুড়ে ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ, রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন আদর্শের ব্যক্তি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মাজার, দরগা ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও কোথাও কোথাও মব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মব সহিংসতায় জড়িতদের ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে উল্লেখ করার বক্তব্যও এসেছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের মতে, সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, সরকার কেন মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সাইদুর রহমান সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, মব সহিংসতা ঠেকাতে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগই নেই। তার ভাষায়, এগুলো বন্ধ করার জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার স্পষ্ট কোনো উদাহরণ নেই। তিনি দাবি করেন, সরকার চায় না বলেই কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স একটি প্রকট ও প্রাণঘাতী প্রবণতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মব জাস্টিস ও গণপিটুনির ঘটনা তিনগুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে মব তৈরি করে পিটিয়ে ১২৬ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটলেও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬০ জনে।
সাইদুর রহমান মনে করেন, এই পরিস্থিতি বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতারই প্রতিফলন। তার মতে, মানুষ যখন ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে, তখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তিনি আরও বলেন, একেক সরকারের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়। আগের সরকার অভিযোগ অস্বীকার করত, আর বর্তমান সরকারের কাছে প্রশ্ন করলে অনেক সময় তারা বলেন, জানি না, পরে জানাব।
তার দাবি অনুযায়ী, মব সহিংসতা বন্ধে উদ্যোগ না নেওয়ার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো সরকারের অনীহা, আরেকটি হলো উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেই কিছু মানুষ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছেন। তার অভিযোগ, উপদেষ্টা পরিষদের ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ভ্যানচোর সন্দেহে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাসহ বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। আসকের হিসাবে, গত বছর ঢাকাসহ আট বিভাগে মব তৈরি করে গণপিটুনিতে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১২৮।
প্রতিবেদনটি বলছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মানবাধিকারের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আসেনি। বরং পুরোনো নিপীড়নের ধারাবাহিকতা নতুন রূপে অব্যাহত রয়েছে, যা সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে অন্তত ১৬৮ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে মানবাধিকার কর্মী সাইদুর রহমান অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যেই কেউ কেউ মব উস্কানিদাতাদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার দাবি, বাইরে থেকে যারা উস্কানি দেয়, তাদের সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের কেউ না কেউ যুক্ত থাকতে পারেন, নইলে সরকার চাইলে এই সহিংসতা থামাতে পারত।
মব সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার মাজারে হামলার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্ষম করে তোলার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত প্রস্তুতি সরকারের নেই।
এ বিষয়ে জানতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক এনামুল হক সাগর জানিয়েছেন, মব সন্ত্রাসের প্রতিটি ঘটনাকে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, মব সন্ত্রাস অনেক সময় হঠাৎ সৃষ্ট আবেগনির্ভর সহিংসতা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পরিকল্পিতও হয়ে থাকে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং তাৎক্ষণিক জনরোষ পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ধরনের সহিংসতাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করে না।
পুলিশের উপস্থিতিতেও মব সহিংসতা কেন ঘটে, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তার দাবি অনুযায়ী, মব সহিংসতা রোধে পুলিশের প্রয়োজনীয় আইনগত ও অপারেশনাল সক্ষমতা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল, বিট পুলিশিং জোরদার, দ্রুত রেসপন্স টিম মোতায়েন, গুজব প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সব মিলিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মূল্যায়ন বলছে, মব সন্ত্রাস এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরছেন তারা।
সূত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au