মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগে হিন্দু যুবক গ্রেপ্তার
মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে শ্যামল গাইন (২০) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার…
মেলবোর্ন, ২ জানুয়ারি ২০২৬- বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আবারও রক্তাক্ত ও আতঙ্কিত। ইসলামিক উগ্রপন্থীদের ধারাবাহিক হামলার মুখে দাঁড়িয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে। ঢাকায় ছায়ানট ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বরের অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর এক গভীর আঘাত। এই হামলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের ছবিও, যাঁরা এই জাতির চেতনার মূল স্তম্ভ। একজন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা, অন্যজন বিদ্রোহী কণ্ঠের প্রতীক, অথচ তাঁদের ছবিও উগ্রবাদী আগুনে পুড়ে গেছে।
এই হামলাগুলো আবার সামনে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশের বহুদিনের দ্বন্দ্ব—বাংলালি পরিচয় বনাম উগ্র ইসলামি পরিচয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই রাষ্ট্রটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তার মূলেই ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার। উর্দুভাষী পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহ ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়, ছিল সাংস্কৃতিক মুক্তিরও সংগ্রাম। সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে ছায়ানট ও উদীচী।

ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকার চায়ানট ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়, যেখানে পুড়ে গেছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ছবি, বাদ্যযন্ত্র ও মূল্যবান বই। ছবি: সংগৃহীত
এই সাম্প্রতিক হামলায় শুধু সাংস্কৃতিক সংগঠনই নয়, দেশের দুই বড় গণমাধ্যমের কার্যালয়েও আক্রমণ হয়েছে, আর একই সময়ে এক হিন্দু সংখ্যালঘু নাগরিককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন ঘটনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দেশটি অস্থিরতার মধ্যেই রয়েছে, আর এই অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো।
সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থতা নিয়েও সমালোচনা তীব্র হয়েছে। উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেছেন, এই হামলা আসলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এক বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে সরিয়ে উগ্র ধর্মীয় পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া। তাঁর ভাষায়, যারা এই হামলা চালিয়েছে, তারাই সেই শক্তি যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শ ও চেতনাকে ধ্বংস করতে চায়।
ছায়ানট ও উদীচী উভয়ই ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত, এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সংগীত ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়ের ভিত গড়ে তুলেছিল। আজ উদীচীর প্রায় ১৫ হাজার সদস্য সারা দেশে ছড়িয়ে আছে, আর ছায়ানটের ঢাকার সংগীত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। কিন্তু এই সংগঠনগুলোর ইতিহাস রক্তাক্ত। ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণে ১০ জন প্রাণ হারান, ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় আরেক হামলায় মারা যান আটজন। সবগুলোর পেছনেই ছিল ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী।
ছায়ানটের সভাপতি ড. সরওয়ার আলী বলেন, এই গোষ্ঠীগুলো মনে করে বাঙালি গান ও সংস্কৃতি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা চায় বাংলাদেশ একটি একমাত্রিক ধর্মীয় পরিচয়ের রাষ্ট্র হোক। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা, লোকসংস্কৃতির ওপর চাপ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বাতিল—সবই সেই একই প্রবণতার অংশ।
থিংকট্যাংক বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ফয়েজ সোবহান বলেছেন, শেখ হাসিনা অপসারিত হওয়ার পর পুলিশ ও প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে এসব গোষ্ঠী আরও বেপরোয়া হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে তারা সংখ্যালঘু ও তথাকথিত “অইসলামিক” প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করে নিজেদের ভোটব্যাংক শক্ত করতে চায়।
ছায়ানটের ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ২৪ মিলিয়ন টাকা। পুড়ে গেছে বই, ভেঙেছে বাদ্যযন্ত্র, নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি ভয়। অনেক শিল্পী আতঙ্কে ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছেন। তবুও উদীচী ও ছায়ানট পিছু হটেনি। ২০ ডিসেম্বর, হামলার পরদিনই উদীচীর সদস্যরা ভাঙা অফিসের সামনে গান গেয়ে প্রতিবাদ করেন। সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। উদীচী ঘোষণা দিয়েছে, তারা জনগণের অনুদানে তাদের অফিস পুনর্নির্মাণ করবে।ছায়ানটের পক্ষেও জনসমর্থন ঢল নেমেছে। ২৩ ডিসেম্বর দুই হাজারের বেশি মানুষ ছায়ানটের সামনে জড়ো হয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘একলা চলো রে’ গেয়েছেন, যার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
ছায়ানট আবার নিয়মিত ক্লাস শুরু করেছে। ড. আলী বলেছেন, এই জনসমর্থনই তাদের সাহস দেয়। বিএনপির নেতা তারেক রহমানও বলেছেন, বাংলাদেশ পাহাড়-সমতল, মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার দেশ। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা কঠিন।
তারপরও উদীচী ও ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলো লড়াই ছাড়ছে না। তারা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, যেখানে গান গাইতে ভয় থাকবে না, ছবি আঁকতে বাধা থাকবে না, নাটক মঞ্চস্থ করতে কেউ রক্তচক্ষু দেখাবে না। মুক্তিযোদ্ধারা যে ধর্মনিরপেক্ষ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য লড়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ গড়ার লড়াই তারা চালিয়ে যাবেই।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au