চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৭ জানুয়ারি- পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে রাজ্যে একের পর এক হিন্দু ধর্মীয় পরিসর নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এপ্রিল মাসে সৈকত শহর দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর গত সপ্তাহে কলকাতা সংলগ্ন নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গন পরিসরের শিলান্যাস করেন তিনি। এবার জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরে মহাকাল মন্দির পরিসরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজ্য সরকার।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বিভিন্ন তীর্থস্থানের পরিকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিয়েছে তৃণমূল সরকার। সর্বশেষ উদাহরণ গঙ্গাসাগর। সোমবার পাঁচই জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরের তীরে গঙ্গাসাগরের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সড়ক যোগাযোগ সহজ করতে ১৭০০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু প্রকল্পের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই।
বিজেপির দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, মমতা ব্যানার্জী মুসলমান তোষণের রাজনীতি করেন। সেই অভিযোগের জবাব দিতেই কি এই একের পর এক মন্দির এবং ধর্মীয় পরিসর গড়ার উদ্যোগ? নাকি আসন্ন রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরও কিছু হিন্দু ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে টানার কৌশল হিসেবেই এই প্রকল্পগুলো সামনে আনা হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই উদ্যোগগুলোর পেছনে সরাসরি ভোটের রাজনীতির কথা মানতে নারাজ। দলটির যুক্তি, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ এবং তার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন, তখন সেই নিয়েও প্রশ্ন ওঠে না। আর বিজেপি বলছে, মমতা ব্যানার্জীর মন্দির গড়ার উদ্যোগ ভালো হলেও তিনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রী যে ‘নরম হিন্দুত্বের পথ’ নিয়েছেন, সেই পথ আগেও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অ-বিজেপি নেতারা নিয়েছিলেন। দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল কিংবা কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর এমন প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভোটে সাফল্য আনতে পারেনি। কারণ হিন্দু ধর্মীয় আবেগকে ভোটে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বিজেপি অনেক বেশি দক্ষ।
এই প্রেক্ষাপটে বিজেপি নাগরিকত্ব, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে ছেড়ে দেওয়ার মতো বিষয়কেও রাজনৈতিক আলোচনায় টেনে এনে হিন্দু আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মমতা ব্যানার্জীর সরকারের মন্দির প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, গত বছরের এপ্রিল মাসে দীঘায় নতুন জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন করা হয়। এরপর চলতি মাসে নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস হয়। প্রায় ১৭ একর জমির ওপর এই দুর্গা অঙ্গন গড়ে তোলা হবে, যেখানে মন্দিরের পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক পরিসরও থাকবে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া কলকাতার দুর্গাপুজোকে ঘিরে আরও পর্যটক আকৃষ্ট করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।
শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাকে অনেকেই তোষণের রাজনীতির জন্য অভিযুক্ত করেন, কিন্তু তিনি নিজেকে প্রকৃত অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ বলে মনে করেন। সব ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করেন তিনি। কোনো ধর্মীয় উৎসব নেই যেখানে তিনি যাননি বলেও দাবি করেন মমতা ব্যানার্জী।
দুর্গা অঙ্গনের আগেই তিনি ঘোষণা দেন, শিলিগুড়িতে একটি মহাকাল মন্দির নির্মাণ করা হবে। গত বছরের নভেম্বরে রাজ্য মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয়, শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকায় মহাকাল মন্দিরের পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা হবে। মন্দিরের জন্য ২৫ একর এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য আরও তিন একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী ১৬ জানুয়ারি এই প্রকল্পের শিলান্যাস হওয়ার কথা রয়েছে।
দীঘা, নিউটাউন ও শিলিগুড়ি, তিন ক্ষেত্রেই মন্দিরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা হচ্ছে এবং পুরো ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ট্রাস্ট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য, এসব মন্দির সরাসরি সরকার তৈরি করছে না এবং সরকারি কোষাগার থেকেও অর্থ ব্যয় হচ্ছে না। দলের মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিৎ মণ্ডল বলেন, এই প্রকল্পগুলো পর্যটন শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীঘার মন্দির উদ্বোধনের পর কয়েক মাসেই এক কোটির বেশি মানুষ সেখানে গেছেন।
অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, এই উদ্যোগ রাজনৈতিক ভয়ের ফল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতা সফরে এসে মন্তব্য করেন, মমতা ব্যানার্জী মন্দির গড়ছেন ভালো কথা, কিন্তু তিনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন। বিজেপি নেতা অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দও বলেন, এতদিন সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি করার পর এখন হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কায় মন্দির বানানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটের ব্যবধান রাজ্যজুড়ে গড়ে চার থেকে পাঁচ শতাংশের মধ্যে। বিজেপি এই ব্যবধান ঘোচাতে পারলেই ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব। তবে তৃণমূলের শক্ত সংগঠন ও আইপ্যাকের মতো পরামর্শদাতা সংস্থার তৈরি কাঠামো তাদের বড় শক্তি।
এক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিজেপি কখনোই প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোট পায় না। ফলে তাদের হিসাব কষতে হয় বাকি ৭০ শতাংশ ভোটারকে ঘিরে। তৃণমূলও চাইছে না তাদের হিন্দু ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে সরে যাক।
সিনিয়র সাংবাদিক অমল সরকারের মতে, ধর্মীয় মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন নয়, তবে এবারের নির্বাচনে সেটিই কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। আসাম ও কেরালার নির্বাচনও একই সময়ে হওয়ায় বিজেপি বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে তার ধারণা।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের মতে, মমতা ব্যানার্জী এই মন্দির প্রকল্পের মাধ্যমে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর অভিযোগ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে যারা কট্টর হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাস করেন, তাদের বিজেপি থেকে সরানো সম্ভব নয়। তৃণমূলের লক্ষ্য মূলত ভাসমান হিন্দু ভোটারদের একটি অংশকে নিজেদের দিকে টেনে আনা।
তার মতে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির মোকাবিলায় ‘নরম হিন্দুত্বের পথ’ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাতে সাফল্য আসেনি। কারণ হিন্দুত্বের রাজনীতিতে বিজেপি অন্য সবার থেকে অনেক এগিয়ে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, একের পর এক মন্দির ও ধর্মীয় প্রকল্প কি মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্ত করবে, নাকি এটি বিজেপির মাঠেই খেলে শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের জন্য উল্টো চাপ তৈরি করবে। এই প্রশ্নের উত্তর দেবে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন।
সূত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au