ইরানের শাহ রাজবংশের উত্তরাধিকারী ও স্বঘোষিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি। ছবি: এএফপি
মেলবোর্ন ১০ জানুয়ারি- ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই রূপ নিয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনে। এই আন্দোলনকে আরও জোরালো করতে প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের ক্ষমতাচ্যুত রাজপরিবারের স্বঘোষিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি। তাঁর ডাকে রাস্তায় নামা মানুষের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি থাকলেও এটুকু স্পষ্ট যে, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় তিনি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন।
রেজা পাহলভির আহ্বানে বৃহস্পতিবার কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ইরান ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি গণমাধ্যম দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল লাখের কাছাকাছি। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় সেদিনই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
রেজা পাহলভি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির ছেলে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতনের পর তিনি পরিবারসহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। নিজেকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ইরানের পক্ষে কথা বলা একজন রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে ইরানের বর্তমান শাসকদের কাছে তিনি বিতর্কিত এক চরিত্র। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তেহরানের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো হলি ড্যাগ্রেস সংবাদ সংস্থা এপিকে বলেন, পাহলভির সাম্প্রতিক আহ্বান বিক্ষোভের গতি ও ভাষা বদলে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের দাবি স্পষ্টভাবে উঠে আসছে, যা আগের আন্দোলনগুলোতে তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
রেজা পাহলভির ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা নতুন নয়। ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, সম্প্রতি তিনি ইসরায়েলের নর্দার্ন ওয়েস্ট ব্যাংক সেটেলমেন্টস কাউন্সিলের প্রধান ইয়োসি দাগানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলের একটি ডানপন্থি টেলিভিশন চ্যানেল সেই বৈঠকের ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে। বৈঠকের বিস্তারিত না জানালেও পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের যোগাযোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এর আগেও ২০২৩ সালে পাহলভি ইসরায়েল সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য হলো ইসরায়েলি জনগণকে বোঝানো যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। ইসরায়েলের তৎকালীন সরকার সেই সফরকে সবচেয়ে প্রভাবশালী কোনো ইরানির ইসরায়েল সফর হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পক্ষ থেকে আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। এর জবাবে ইরানি গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকে বিদেশ থেকে পরিচালিত অস্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেই একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেজা পাহলভিকে নিয়ে কথা বলেন। ট্রাম্প বলেন, পাহলভি একজন ভদ্র মানুষ। তবে ইরানের ভবিষ্যৎ শাসক হিসেবে তাঁকে এগিয়ে রাখার পক্ষে তিনি নন। তাঁর মতে, বিষয়টি খোলা থাকা উচিত এবং সময়ই ঠিক করবে কে নেতৃত্বে আসবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানে ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো পাহলভিকে সরাসরি সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয়নি।

গত বছরের এপ্রিলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করে ইরান।ছবি: এএফপি
ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতেও একাধিকবার ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে ইরানের শাসন পরিবর্তন সহজ নয়।
আলজাজিরার সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জসিম আল-আজ্জাই লিখেছেন, সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে জড়ালে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বর্তমানে ইরানের সক্রিয় ও রিজার্ভ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সেনাসদস্য রয়েছে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের অধীনে আছে অন্তত দেড় লাখ সেনা, যারা বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
বর্তমান বিক্ষোভের সূচনা হয়েছে ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম বেড়ে সাড়ে ১৪ লাখে পৌঁছায়। এক বছর আগেও এই হার ছিল প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে এই অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে।
তেহরানে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন দিয়ে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ইরানের ৩১টির মধ্যে ২৫টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি হাতে এক নারী। ছবি: এএফপি
আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান বিশেষজ্ঞ গিসসু নিয়া মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকট বিক্ষোভের প্রাথমিক উদ্দীপক হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়। তাঁর মতে, স্লোগান ও আন্দোলনের বিস্তার ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানি সমাজে শাসনব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ জমে উঠেছে এবং তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রেজা পাহলভির আহ্বান ইরানের চলমান অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এবং এতে তাঁর ভূমিকা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সুত্রঃ এএফপি