ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ৪৭ বছরের ইতিহাসে এক নতুন ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ছবিঃ এএফপি
মেলবোর্ন, ১২ জানুয়ারি- ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ৪৭ বছরের ইতিহাসে এক নতুন ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। বিক্ষোভের ব্যাপকতা, দাবির ধরন, নেতৃত্বের ইঙ্গিত এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার দিক থেকে এটি আগের যেকোনো আন্দোলনের চেয়ে ভিন্ন রূপ নিয়েছে।
দেশজুড়ে বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। এর জবাবে ইরান ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের ওপর হামলার হুমকি দেয়। ফলে বিক্ষোভ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া দুটোই আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর বিস্তার ও তীব্রতা। সমাজবিজ্ঞানী এলি খোরসান্দফার বলেন, ইরানের বড় শহরগুলোতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত এমন সব ছোট শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলোর নাম অনেকেই আগে শোনেননি। অতীতে ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ মূলত মধ্যবিত্ত ও বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল। আবার ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল দরিদ্র এলাকাগুলোতে। ২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর যে বিক্ষোভ হয়েছিল, সেটি ছিল বড় পরিসরের, তবে সময়ের সঙ্গে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
এর বিপরীতে, চলতি বছরের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই আরও বিস্তৃত ও গভীর হচ্ছে। প্রথমে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ তৈরি হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা পুরো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম ইরানের তুলনামূলক দরিদ্র প্রদেশগুলোতে। পরে মধ্যবিত্তসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। রাস্তায় রাস্তায় ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে দেশ। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ও তার সরকারের অপসারণের দাবিও উঠছে প্রকাশ্যে।
এবারের আন্দোলনে আরেকটি নতুন দিক হলো নেতৃত্বের ইঙ্গিত। ২০২২ সালের আন্দোলনে দৃশ্যমান কোনো নেতৃত্ব না থাকায় তা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এবারের বিক্ষোভে নির্বাসনে থাকা ইরানি নেতা রেজা পাহলভির ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, যা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে আন্দোলনকারীরা সরকারের পতনের পর একটি সম্ভাব্য বিকল্পের ইঙ্গিত পাচ্ছেন। তবে এটিকে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং ইসলামি শাসনের বিকল্প নেতৃত্বের অভাবজনিত হতাশার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এবারের বিক্ষোভকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের হুমকি আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০০৯ সালের আন্দোলনের সময় ওবামা প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছিল, তার বিপরীতে এবার হোয়াইট হাউসের অবস্থান স্পষ্ট। একই সময়ে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ ক্ষমতাচ্যুত, লেবাননে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের মিত্রের সংখ্যা কমে এসেছে।
এই বিক্ষোভের পটভূমিতে রয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার স্মৃতি। সাংবাদিক আব্বাস আবদি মনে করেন, এই পরিস্থিতি সরকার চাইলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারত, কিন্তু তা পারেনি। বরং সামরিক আঘাতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মর্যাদা সাধারণ মানুষের চোখে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
খোরসান্দফারের মতে, এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ভয় ভাঙার মনস্তত্ত্ব। বিশেষ করে নারীরা প্রকাশ্যে বলছেন, দমনমূলক সরকারের ভয় কাটিয়ে রাস্তায় নামাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। সব মিলিয়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে ইরানের এবারের বিক্ষোভ আগের সব আন্দোলন থেকে স্পষ্টভাবেই আলাদা ও নজিরবিহীন হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা