আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ১২ জানুয়ারি- গুজরাটের পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সোমনাথ মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি হাজার বছরের এক অদম্য ইতিহাসের প্রতীক। ধ্বংস আর পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে বারবার উঠে দাঁড়ানো এই মন্দির ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে। সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত সোমনাথ হিন্দু ধর্মের বারো জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম হিসেবে বিবেচিত। আগুনের ভেতর থেকে বারবার জন্ম নেওয়া ফিনিক্স পাখির মতোই, ধ্বংসের পর ধ্বংস পেরিয়ে আবার গরিমা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এই মন্দির।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি এক বক্তব্যে সোমনাথ মন্দিরকে ‘চিরন্তন দেবত্বের প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এর পবিত্র উপস্থিতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে পথ দেখিয়ে এসেছে। গজনির সুলতান মামুদের হামলার এক হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষে পালিত ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’ বা ‘শৌর্য যাত্রা’ সেই দীর্ঘ ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের ইতিহাস শুরু হয় আরও আগে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে বল্লভী রাজা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু নির্মাণের প্রায় ৭৬ বছরের মাথায় সিন্ধু প্রদেশের আরব শাসক আল জুনায়েদের হাতে এটি প্রথম ধ্বংস হয় বলে ধারণা করা হয়। এরপর পুনর্নির্মিত মন্দির আবারও ধ্বংস হয়েছিল, যদিও সেই আক্রমণকারীর পরিচয় ইতিহাসে স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে দেখা যায়, সুলতান মামুদই প্রথম নন, তার আগেও এই পবিত্র স্থাপনাটি একাধিকবার আক্রমণের শিকার হয়েছে।
তবে ১০২৬ সালে গজনির সুলতান মামুদের হামলাই ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও আলোচিত। সোলাঙ্কি রাজা মুলরাজের হাতে পুনর্নির্মাণের মাত্র আড়াই দশকের মধ্যেই এই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। মামুদ একজন দক্ষ প্রশাসকের চেয়ে নির্মম লুণ্ঠনকারী হিসেবেই বেশি পরিচিত। আফগানিস্তানভিত্তিক তাঁর শাসনকালে ধারাবাহিক লুট, ধ্বংস আর সহিংসতার ছাপ স্পষ্ট। ১০২২ সালে সোমনাথ মন্দিরের বিপুল সম্পদের কথা জানতে পেরে তিনি সরাসরি হামলা চালাননি। বরং প্রায় তিন বছর ধরে গোয়েন্দা পাঠিয়ে মন্দির ও আশপাশের এলাকা সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করেন। কেউ ফকির, কেউ ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ওই গোয়েন্দারা নদী, পথ, জনপদ এমনকি স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থার খবরও নিয়ে আসে।
সবচেয়ে লোভনীয় তথ্য ছিল, সোমনাথ মন্দিরে জমা সম্পদ অনেক রাজকোষের চেয়েও বেশি। কিন্তু তাড়াহুড়ো না করে মামুদ সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নেন। প্রায় ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী, চুয়ান্ন হাজার পদাতিক এবং ত্রিশ হাজার উট নিয়ে বিশাল বাহিনী গঠন করা হয়। মরুভূমি পেরোনোর জন্য অতিরিক্ত উট ও পানির ব্যবস্থা করা হয়। ১০২৫ সালের ৯ নভেম্বর রমজান মাসে তাঁর বাহিনী মুলতানে পৌঁছায়। রোজার কারণে রসদের সংকট তৈরি হওয়ায় কিছু সময় অভিযান স্থগিত রাখা হয়।
মরুপথ বেছে নেওয়ার পেছনেও ছিল কৌশল। অন্য রাজ্যের ভেতর দিয়ে গেলে বাধার মুখে পড়তে হতে পারে, এই আশঙ্কায় অপেক্ষাকৃত কঠিন পথই বেছে নেন তিনি। তবুও পথে বাধা আসে। লণ্ডরাওয়ার রাজপুত শাসক রাওয়াল অমর সিং এবং পরে রাজা ভীমদেব প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কোথাও আত্মসমর্পণ, কোথাও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসে মামুদের বাহিনী। মোধেরার কাছে হাজার হাজার রাজপুত যোদ্ধার সঙ্গে ভয়াবহ লড়াই হয়। এসব সংঘর্ষ আর দীর্ঘ অভিযানে রোগব্যাধিও ছড়িয়ে পড়ে বাহিনীর মধ্যে।
সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সোমনাথে পৌঁছে যায় গজনির সেনা। মন্দিরের কোনো নিজস্ব সামরিক বাহিনী ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দা, মন্দিররক্ষী ও ব্রাহ্মণরাই অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের সাহস মামুদকেও বিস্মিত করেছিল। তবুও প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে। বিপুল পরিমাণ সোনা, রত্ন ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়। মন্দিরের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, অসংখ্য নারী ও পুরুষকে দাস হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারি নথিতে দাবি করা হয়, লুটের পরিমাণ ছিল প্রায় দুই কোটি দিনার।
মামুদের পরও সোমনাথের ওপর হামলা থেমে থাকেনি। খিলজি শাসকদের সেনা এবং পরবর্তী গুজরাটের মুসলিম শাসকরাও একাধিকবার মন্দিরটি ধ্বংস করেন। শেষ বড় আঘাত আসে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে, ১৬৬৫ সালে। এরপর দীর্ঘদিন ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে থাকে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।

১৭৮৩ সালে মারাঠা শাসকেরা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও তা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে আধুনিকভাবে সোমনাথ মন্দির পুনর্গঠন করা হয়। সেই আধুনিকীকরণের পঞ্চাশ বছর পূর্তি পালিত হয় ২০০১ সালে। আর সম্প্রতি সেই পুনর্নির্মাণের ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।
আজ সোমনাথ মন্দির শুধু হিন্দুদের নয়, বরং উপমহাদেশের সামগ্রিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গর্বের প্রতীক। শত শত বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ, লুণ্ঠন আর ধ্বংসের মুখেও এর অস্তিত্ব বারবার ফিরে এসেছে নতুন রূপে। এই পুনর্জন্মের ধারাই সোমনাথকে হাজার বছরের এক অমর ঐতিহ্যে পরিণত করেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au