নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার অঙ্গীকার ইরানের শেষ শাহপুত্রের। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ জানুয়ারি: ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি বলেছেন, দেশজুড়ে চলমান সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন অবশ্যম্ভাবী। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইরানে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন এবং দেশে ফিরে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে পাহলভি বলেন,
“ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবেই—প্রশ্ন কেবল কবে। আমি আজীবনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি যে, এই দখলদার ও জনগণের হত্যাকারী শক্তির হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে আমি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেব। আমি ইরানে ফিরব।”
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে তাঁর পশ্চিমাপন্থী পিতা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভে বহু মানুষ তাঁর নাম ধরে স্লোগান দিয়েছে, এবং তাঁকে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে—যিনি ইরানকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারেন।
পাহলভি দাবি করেন, তাঁর কাছে একটি “সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা” প্রস্তুত রয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর করা সম্ভব। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি বারবার হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ড কাঠামোকে লক্ষ্য করে “সার্জিক্যাল স্ট্রাইক” প্রয়োজন। জুন মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতিও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
তাঁর ভাষায়,
“ইরানি জনগণ মাটিতে দাঁড়িয়ে লড়াই চালাচ্ছে। এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পুরোপুরি তাদের পাশে দাঁড়ানোর।”
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা এক ধরনের “দখলদার শক্তি”, যা গণহত্যা, সন্ত্রাস রপ্তানি এবং পারমাণবিক হুমকির জন্য দায়ী।
কঠোর দমনপীড়নে স্তিমিত বিক্ষোভ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং নজিরবিহীন দমন অভিযানের ফলে আপাতত বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এত বিপুল নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন টেকসই নয়—যে কোনো সময় আন্দোলন আবার জেগে উঠতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠন HRANA-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৬৭৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২,৪৭৮ জন বিক্ষোভকারী। সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, এবং অনেক সংগঠনের মতে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজার ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের দাবিতে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ৮ জানুয়ারি থেকে বড় শহরগুলোতে মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করলে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়—যা ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে দীর্ঘ ব্ল্যাকআউট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ট্রাম্পের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেননি এবং বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের কূটনৈতিক তৎপরতার পর ওয়াশিংটন আপাতত কিছুটা সংযত অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
রেজা পাহলভির মতে, লেবানন ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সমর্থন প্রমাণ করে যে ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বিশ্বের সব দেশকে ইরানি কূটনীতিকদের বহিষ্কারের আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দমনপীড়নে সাময়িক বিরতি এলেও ইরানের গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও জনঅসন্তোষ আবারও বড় ধরনের রাজনৈতিক বিস্ফোরণের পথ তৈরি করছে।
AFP