মেলবোর্ন, ২৭ জানুয়ারি- দেশে আত্মহত্যা এখন নীরব কিন্তু ভয়াবহ এক সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো আত্মহত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৪৯১ জন। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ জনে। ডিসেম্বর মাসের তথ্য এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় ওই সময়ের হিসাব যুক্ত হয়নি।
আত্মহত্যার এই প্রবণতা নতুন নয়। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ বা সিআইপিআরবির করা জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছেন ২০ হাজার ৫০৫ জন মানুষ। আবার পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯২০। ভিন্ন ভিন্ন উৎসের পরিসংখ্যান হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, বছর বছর আত্মহত্যা একটি স্থায়ী ও গুরুতর সমস্যা হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি আত্মহত্যায় প্রাণ হারানো নারী ও পুরুষের অন্তত ১০টি পরিবারের স্বজনেরা জানিয়েছেন, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংকট, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ, মানসিক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা একসঙ্গে কাজ করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মানুষ মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার সময় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি, কাউন্সেলিং বা পেশাদার সহায়তা নেননি।
সর্বশেষ সোমবার গাজীপুরের পূবাইল এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় গৃহবধূ হাফেজা খাতুন মালা দুই সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর আগে ১৬ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বড় মগবাজারে স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন শম্পা আক্তার রিভা নামে এক তরুণী। শুধু ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি এই দুই দিনেই রাজধানীতে অন্তত ছয়জন আত্মহত্যা করেন বলে জানা যায়।
শম্পা আক্তার রিভা আত্মহত্যার ঠিক আগে স্বামী সুমনের মোবাইল ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। সেখানে তিনি বলেন, স্বামীর সঙ্গে তাঁর কোনো অন্যায় হয়নি, তবু তাঁকে চিৎকার করে কথা বলা হয়েছে এবং নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। ওই বার্তায় তাঁর মানসিক কষ্ট ও অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শম্পার স্বামী দাবি করেছেন, তাঁর স্ত্রী জেদি প্রকৃতির ছিলেন এবং ছোটখাটো বিষয় দীর্ঘদিন মনে পুষে রাখতেন। অন্যদিকে শম্পার বাবা আকরাম হোসেন বলেন, প্রেম করে বিয়ে হলেও তাঁদের দাম্পত্য জীবনে নিয়মিত কলহ চলছিল।
মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় খিলগাঁওয়ের ঘটনায়। গত শনিবার সেখানে শাহানুর রহমান নামে ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যাংক কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেন। তাঁর ভাই মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় দুই মাস আগে শাহানুরের সঙ্গে স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঋণসহ নানা কারণে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন এবং বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।
সম্পর্কজনিত সংকটও আত্মহত্যার বড় কারণ হয়ে উঠছে। গত ১৭ জানুয়ারি রাতে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় কলেজছাত্রী সানজিদা ইসলাম মিম আত্মহত্যা করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, সাত বছরের প্রেমের সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গই ছিল এই ঘটনার মূল কারণ। মিম জানতে পারেন, যাঁর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, তিনি আরেক তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং সেই সম্পর্কের ছবি মিমের কাছে পাঠানো হয়। এই মানসিক আঘাত তিনি সহ্য করতে পারেননি।
এর আগের দিন ১৬ জানুয়ারি ডেমরার পূর্ব বক্সনগরে আত্মহত্যা করেন পোশাকশ্রমিক কোহিনুর বেগম। তাঁর পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেননি। তবে পরিবারের ইতিহাসেই ছিল একের পর এক ট্র্যাজেডি। প্রায় এক দশক আগে তাঁর ১১ বছর বয়সী মেয়েও আত্মহত্যা করেছিল। কোহিনুরের ভাই মিজানুর রহমান বলেন, ঢাকায় ফেরার আগ পর্যন্ত তাঁর বোনের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। কেন হঠাৎ করে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা তাঁরা আজও বুঝে উঠতে পারছেন না।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আত্মহত্যা কখনো একক কোনো ঘটনার ফল নয়। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা একাধিক মানসিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপ একসময় মানুষকে এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর মতে, দায়িত্ববোধী, নিয়মকানুন মেনে চলা এবং নিজের কষ্ট গোপন করে সমাজের জন্য কাজ করতে চাওয়া মানুষের মধ্যেই আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হলে সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সবার জন্য কার্যকর জীবন কাঠামো নিশ্চিত না হওয়ায় সংকটের সময় মানুষ একা হয়ে পড়ে। সম্পর্কজনিত বিরোধ, সামাজিক অসহযোগিতা এবং ন্যূনতম জীবনমানের অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করে। এই হতাশা থেকেই মানসিকভাবে দুর্বল মানুষ মৃত্যুকে মুক্তির পথ হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আত্মহত্যা রোধে পারিবারিক বিরোধ ও মানসিক সংকটে দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। কমিউনিটি পুলিশিং, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কাউন্সেলিং সেবা এবং সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি জানান, জরুরি মুহূর্তে আত্মহত্যার ঝুঁকির তথ্য পেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে দ্রুত পুলিশ ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠিয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা করা হয়।
ক্রমবর্ধমান এই পরিসংখ্যান আর একের পর এক হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, আত্মহত্যা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি বড় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো সহানুভূতিশীল উদ্যোগ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে এই নীরব মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হয়ে উঠবে।
সূত্রঃ দৈনিক সমকাল