আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২৭ জানুয়ারি- একটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বেসামরিক কাজের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের বাধ্য করা হয় সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে এবং পাঠানো হয় ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি ময়দানে। হুমকি, নির্যাতন ও প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেই কাটে তাঁদের দিনগুলো।
গ্রামের দারিদ্র্য আর কাজের অভাব থেকে মুক্তির আশায় মাকসুদুর রহমান রাজি হয়েছিলেন হাজার হাজার মাইল দূরের রাশিয়ায় যেতে। এক শ্রম দালাল তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, রাশিয়ায় একটি সামরিক ক্যাম্পে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ মিলবে। মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডলার বেতন, সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসের সম্ভাবনাও।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। রহমান নিজেকে খুঁজে পান ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের সামনের সারিতে, অস্ত্র হাতে, বাংকারে বসবাস করতে বাধ্য হয়ে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রহমানের মতো আরও বহু বাংলাদেশি শ্রমিককে বেসামরিক কাজের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় আনা হয়েছিল। পরে তাঁদের জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয় এবং পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। অনেকে জানিয়েছেন, আদেশ অমান্য করলে তাঁদের সহিংসতা, দীর্ঘ কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এপি তিনজন বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা কোনোভাবে রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। রহমান জানান, মস্কোতে পৌঁছানোর পর তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের রুশ ভাষায় লেখা কিছু নথিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তাঁরা ভেবেছিলেন, সেগুলো পরিচ্ছন্নতার কাজের চুক্তি। পরে বুঝতে পারেন, সেগুলো ছিল সরাসরি সামরিক চুক্তি।
এরপর তাঁদের একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ড্রোন যুদ্ধ, ভারী অস্ত্র ব্যবহার, আহতদের সরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসহ মৌলিক যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
রহমান বলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেছিলেন। জানান, এ ধরনের কাজের জন্য তিনি আসেননি। জবাবে এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, “তোমার এজেন্ট তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাদের কিনে নিয়েছি।”
রহমান ও অন্য দুই বাংলাদেশি জানান, তাঁদের জোর করে সম্মুখভাগে নানা বিপজ্জনক কাজে পাঠানো হতো। কখনো রুশ বাহিনীর সামনে এগিয়ে যেতে, কখনো রসদ বহন করতে, কখনো আহত সৈন্যদের সরাতে কিংবা নিহতদের মরদেহ সংগ্রহ করতে।
নিখোঁজ তিনজন বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যরাও এপি’কে বলেছেন, তাঁদের স্বজনেরা ফোনে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। তবে এরপর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকার এপি’র প্রশ্নের তালিকার কোনো জবাব দেয়নি।
রহমান জানান, তাঁর দলে থাকা শ্রমিকদের ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হতো। অনেককে মারধরও করা হয়েছে।
“ওরা বলত, ‘কাজ করছ না কেন? কাঁদছ কেন?’ তারপর লাথি মারত,” বলেন রহমান। সাত মাস পর সুযোগ পেয়ে তিনি পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
শ্রমিকদের বর্ণনার সত্যতা যাচাই করেছে এপি। ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তি, চিকিৎসা ও পুলিশ প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ছবি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেওয়া ভিসা, যুদ্ধে তাঁদের আঘাত পাওয়া এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রমাণ।
কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁরা জানিয়েছেন, ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা শত শত বাংলাদেশিকে দেখেছেন।
কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বাংলাদেশ ছাড়াও আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ থেকে লোকজনকে একইভাবে নিয়োগ করেছে রাশিয়া। এর মধ্যে ভারত ও নেপালের নাগরিকরাও রয়েছেন।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লক্ষ্মীপুর জেলার মতো এলাকায় বিদেশে কাজ করা প্রায় প্রতিটি পরিবারের বাস্তবতা। কাজের সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবারই নির্ভর করে প্রবাসী আয়ের ওপর। বাবারা বছরের পর বছর দেশের বাইরে থাকেন। অল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরে আবার চলে যান। সন্তানদের বড় হওয়া দেখার সুযোগও অনেকের হয় না।
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় একটি চুক্তির কাজ শেষ করে রহমান দেশে ফিরে নতুন কাজ খুঁজছিলেন। তখনই তিনি ওই দালালের ফাঁদে পড়েন। ১২ লাখ টাকা দালালকে দিতে গিয়ে তাঁকে ঋণ নিতে হয়। ডিসেম্বর ২০২৪ সালে তিনি মস্কো পৌঁছান।
সেখান থেকে তাঁকে মস্কোর বাইরে একটি সামরিক স্থাপনায় নেওয়া হয়। তিন দিনের প্রশিক্ষণের পর তাঁকে রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের কাছে পাঠানো হয়। বৃষ্টিতে ভেজা, পানি চুইয়ে পড়া বাংকারে থাকতে হতো। দূরে বোমার বিস্ফোরণ, মাথার ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেত।
“একজন খাবার দিচ্ছিল। পরের মুহূর্তেই ড্রোন থেকে গুলি লাগল, সে সেখানেই পড়ে গেল। তারপর আরেকজনকে তার জায়গায় বসানো হলো,” বলেন রহমান।
এমন অভিজ্ঞতা শুধু রহমানের নয়।
মোহন মিয়াজী নামের আরেক বাংলাদেশি জানান, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে একটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করতে গিয়ে চরম শীত ও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি। পরে অনলাইনে কাজ খুঁজতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে এক রুশ সেনা নিয়োগকারীর যোগাযোগ হয়।
মিয়াজী বলেন, তিনি স্পষ্ট করে জানান যে কাউকে হত্যা করতে চান না। তখন নিয়োগকারী তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তাঁর কাজ হবে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা ড্রোন ইউনিটে, যা যুদ্ধের বাইরে।
কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে দখলকৃত ইউক্রেনীয় শহর আভদিভকার একটি সামরিক ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে কমান্ডার তাঁকে জানিয়ে দেন, তাঁকে একটি ব্যাটালিয়নে যোগ দেওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়েছে এবং অন্য কোনো কাজের সুযোগ নেই।
মিয়াজীর ভাষ্য অনুযায়ী, আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বেলচা দিয়ে মারধর করা হয়, হাতকড়া পরানো হয় এবং একটি সঙ্কুচিত বেসমেন্ট কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত মিয়াজীও কোনোভাবে ফিরে আসতে সক্ষম হন। তবে তাঁর মতো অনেকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা আজও অজানা।
এই অনুসন্ধান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, বিদেশে কাজের নামে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, দালালচক্রের তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শ্রমিক পাচার ঠেকাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au