প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। (ছবি: কেন কিভাবে-YouTube)
মেলবোর্ন, ১ ফেব্রুয়ারি: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। ওই দিন ভোটারদের হাতে থাকবে দুটি ব্যালট—একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য, অন্যটি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটের জন্য।
গণভোটের ব্যালটে ভোটারদের সামনে রাখা হবে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন। মূল প্রশ্ন একটাই—জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি আছে কি না। এর উত্তরে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।
কিন্তু এই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর ফলাফল বাস্তবে কী অর্থ বহন করে, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গণভোটের পটভূমি ও সরকারের অবস্থান
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ থেকে ১৬৬টি প্রস্তাবের আলোচনার পর ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (NCC) সনদটি চূড়ান্ত করে। ৩২টি ও পরে ৩০টি দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে; তবু বহু প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট রয়ে গেছে, কিছু দল স্বাক্ষরই করেনি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমদিকে গণভোট নিয়ে নিরপেক্ষ প্রচারণা চালালেও সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়। এই প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যে উঠে আসে—‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে বাংলাদেশ অগ্রসর হবে।
জুলাই সনদ: কত প্রস্তাব, কত স্তর
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। এগুলো দুই ভাগে বিভক্ত—
তবে এই প্রস্তাবগুলোর বেশ কয়েকটিতে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে।
গণভোট কেন, সমঝোতা কেন ভাঙল
বহু রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনার পর এই সনদে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে সব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, অনেক প্রস্তাবের সঙ্গে নোট অব ডিসেন্ট রয়ে গেছে, কিছু দল সনদে স্বাক্ষর করেনি এবং বাস্তবায়নের আইনি কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে ভোটারদের সামনে তিনটি বাস্তব অবস্থান তৈরি হয়েছে—‘হ্যাঁ’, ‘না’ এবং ‘দ্বিধা’। প্রথমদিকে পরিকল্পনা ছিল—যেসব প্রস্তাবে কোনো দলের ভিন্নমত থাকবে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু এই ব্যবস্থায় ঐকমত্য তৈরি না হওয়ায় সরকার শেষ পর্যন্ত গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে পরবর্তী সংসদ পুরো ৮৪টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাজনৈতিকভাবে বাধ্য থাকবে। আর ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে।
‘হ্যাঁ’ ও ‘না’—এর অর্থ কী?
এই গণভোট কোনো দলীয় প্রতীক-নির্ভর পছন্দ নয়; এটি জুলাই জাতীয় সনদকে (July National Charter) এক প্যাকেজ হিসেবে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের প্রশ্ন।
-
‘হ্যাঁ’ ভোট মানে—রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে একটি সম্মিলিত রূপরেখাকে নীতিগতভাবে সমর্থন।
-
‘না’ ভোট মানে—এই রূপরেখা, তার বাস্তবায়ন-পদ্ধতি, কিংবা অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির প্রতি অনাস্থা।
সংবিধান বদলাবে কীভাবে
জুলাই সনদ কার্যকর হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় একাধিক বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
-
রাষ্ট্রীয় পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশি’
-
সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার
-
অন্য মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি
-
সংবিধান সংশোধনে দুই কক্ষের সংসদের সম্মতি
-
নির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ পরিবর্তনে গণভোট বাধ্যতামূলক
এছাড়া মৌলিক অধিকারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক
জুলাই সনদে জরুরি অবস্থা জারি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক ক্ষমতা কমিয়ে যৌথ ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—এমন প্রস্তাবও রয়েছে।
সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রস্তাবিত পরিবর্তন
-
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন
-
উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব
-
সংরক্ষিত নারী আসন ১০০-তে উন্নীতকরণ
-
বাজেট ও আস্থা ভোট ছাড়া এমপিদের স্বাধীন ভোটাধিকার
-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন
বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার
জুলাই সনদে বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার সাংবিধানিক নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, বিচারক সংখ্যা নির্ধারণ ও নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
পাশাপাশি ন্যায়পাল, নির্বাচন কমিশন, দুদক ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
গণভোটের ব্যালটে ৮৪টি প্রস্তাবের বিস্তারিত কিছুই থাকবে না—থাকবে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্ট। এখানেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। সমস্যা এখানেই—চারটি বড় বিষয়ে পৃথক মতভেদের সুযোগ না রেখে একটি উত্তরেই সব প্রশ্ন বাঁধা। ফলে কোনো দল বা নাগরিক যদি একটি প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি রাখেন, তাকেও পুরো প্যাকেজে ‘না’ বলতে হতে পারে। এতে সম্মত সংস্কারগুলোও ঝুঁকিতে পড়ে।
আইনজ্ঞদের মতে, জনগণ যেটিতে ভোট দিচ্ছে আর যেটি বাস্তবে বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে—এই দুয়ের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া বাংলানিউজকে বলেন, গণভোটে হ্যাঁ পরাজিত হলে যারাই ক্ষমতায় আসবে তাদের মধ্যে স্বৈরাচার হওয়ার প্রবণতা থাকবে। তখন দেশে আবারও সরকার পতনের আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান হবে। সংঘাত ও সংঘর্ষ বাড়বে। লং টার্ম সিভিল ওয়ারের দিকে যেতে পারে দেশ। এটাই হয়তোবা কেউ কেউ চাচ্ছে। যার কারণে গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ও প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী মনে করছে, সাংবিধানিক সংস্কার পাস হলেই মূল সংস্কারের কাজ শেষ। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করায় তারা নৈতিকভাবে এটি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—আইনি বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন মুখ্য নয়। উভয় দলই এখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কি পুরো জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে, নাকি কেবল সংবিধান সংশ্লিষ্ট অংশই কার্যকর হবে—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই। আর যদি ‘না’ জয়ী হয় তাহলে কি সংস্কারের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর পুরোপুরি ভাবে ছেড়ে দেওয়া হবে, এই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, বিপুল সংখ্যক মানুষ আজ দ্বিধায়। তারা জানেন সংস্কার দরকার, কিন্তু এই সনদ কি যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাস্তবায়নযোগ্য ও ন্যায়সঙ্গত—সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। অন্যদিকে বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে ফলে নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ থেকে ভোট বর্জনের আহ্বান ও প্রতীকভিত্তিক স্লোগান দিয়ে ভোটার উপস্থিতি কমানোর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামী লীগ কে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ সংস্কারের পথ নিয়েই এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ।
বিশেষ প্রতিবেদন: ওটিএন বাংলা