খুলনা-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ ফেব্রুয়ারি- খুলনা-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী, ব্যবসায়ী ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দী বলেছেন, জামাত-ই-ইসলামি ক্ষমতায় এলে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো মানুষ বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হবেন না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে হিন্দুরা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে। যখন আমি বলি হিন্দুরা সম্মানিত হবেন, এটি কেবল প্রতীকী ভাষা নয়, আইন অনুযায়ী নিরাপত্তা, ন্যায় ও সমান নাগরিকত্বের বাস্তব নিশ্চয়তার কথা বলছি।”
শুক্রবার(৬ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত আল-জাজিরার মতামত কলামে তিনি কথাগুলো বলেন।
প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী জানিয়েছেন, দীর্ঘকাল ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে যে ইসলামী রাজনীতি মানেই তাদের নিপীড়ন। তবে এটি মিথ্যা। তিনি বলেন, “বিপরীতটাই সত্য। জামাত সকলের জন্য ন্যায় নিশ্চিত করে শাসন করবে।” তার প্রার্থিতা মূলত এই ধারণাকে উন্মুক্তভাবে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্যে।
কৃষ্ণ নন্দী ২০০৩ সালে জামাত-ই-ইসলামিতে যোগ দেন। তিনি জানান, এটি কোনো সুবিধাজনক পদক্ষেপ ছিল না, বরং নৈতিক বিশ্বাস ও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে। তিনি বলেন, জামাত ভোট টাকা দিয়ে কিনে না, ভয় বা হুমকির ওপর নির্ভর করে না, এবং সহিংসতার মাধ্যমে শাসন করে না। এই নীতি দলটির অভ্যন্তরে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা, এখন জামাতকে রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নতুনভাবে দেখছে।
খুলনা-১ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। কৃষ্ণ নন্দী স্পষ্ট করেছেন, অন্যায় কোনো ঘটনা উপেক্ষা করা হবে না। যেসব ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় ন্যায় নিশ্চিত করা হবে। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা হয়রানি বরদাস্ত করা হবে না।

সনাতন ধর্মাবলম্বী সমর্থকদের নিয়ে জামায়াতের সভা। ছবিঃ সংগৃহীত
তিনি বলেন, “আমি ব্রোকার-ভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি মধ্যস্থতার মাধ্যমে কাজ করি না। আমার ফোন নম্বর জনগণের সঙ্গে রয়েছে এবং তা থাকবে। প্রতিনিধিত্ব সরাসরি, জবাবদিহিমূলক ও ধারাবাহিক হওয়া উচিত, শুধুমাত্র নির্বাচনের সময় সক্রিয় হওয়া নয়।”
কৃষ্ণ নন্দী মনে করান, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের অধীনে ভুক্তভোগী হয়েছেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের ভুল মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবে রাজনৈতিক আন্দোলন যদি অন্যায়ের মুখোমুখি হয়, তা ভবিষ্যত গড়তে সহায়ক। তিনি বলেন, “জামাত-ই-ইসলামি মুসলিম মূল্যের রাজনৈতিক দল হলেও এটি দেশের দায়িত্বে জাতীয় দল। ন্যায়, জবাবদিহিতা ও মানব মর্যাদা কোনো ধর্মের একচেটিয়া অধিকার নয়।”
জুলাই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীন বোধ করলেও, জামাতের সদস্যরা তাদের মন্দির ও উপাসনালয় সুরক্ষিত রেখেছিলেন। কৃষ্ণ নন্দী বলেন, “ন্যায়ের মাধ্যমে শাসিত রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের ভালোভাবে রক্ষা করে, কোনো স্লোগান নয়। দরিদ্র পরিবারগুলো ধর্ম বা রাজনৈতিক আনুগত্য জিজ্ঞেস না করে জামাতের সামাজিক সেবা পায়। এই সংস্কৃতি দেখায় যে, জামাত শুধুমাত্র স্লোগান নয়, বরং শৃঙ্খলা, কাঠামো ও দায়িত্বশীলতার দল।”
তিনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “এই নির্বাচন কোনো মতাদর্শ আমদানি বা ভীতি রপ্তানি বিষয় নয়। এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থা পুনঃস্থাপনের বিষয়। বাংলাদেশ বাস্তবিকভাবে বহুজাতিক সমাজ; যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি তা উপেক্ষা করে, তা টেকসই শাসন করতে পারবে না।”
কৃষ্ণ নন্দী হিন্দু প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াচ্ছেন জামাতের কারণে নয়, বরং এই বিশ্বাসে যে, দলটির নীতি সকলের জন্য নিরাপদ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সহায়ক। তিনি বলেন, “এই দেশ সবার, কোনো এক সম্প্রদায়ের একচেটিয়া অধিকার নয়।”

জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
প্রার্থী আরও বলেন, দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভয় দূর করা প্রয়োজন। তার প্রার্থিতা এ ভয় দূর করার, সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপত্তা ও ন্যায় নিশ্চিত করার একটি বাস্তব প্রতিশ্রুতি। কৃষ্ণ নন্দীর লক্ষ্য, বাংলাদেশে সকল সম্প্রদায় শান্তি, সম্মান এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।
তিনি মনে করান, জামাত-ই-ইসলামি শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর কাজ করে। তাই সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, এখন নিজেদের রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে জামাতকে দেখতে শুরু করেছে। তার প্রার্থিতা দেশের রাজনীতিতে নতুন ধরনের আলোচনা সৃষ্টি করতে চায়। ভীতি, ধর্মীয় বিভাজন ও পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনের বাইরে।
কৃষ্ণ নন্দী বলেন, “আমার প্রার্থিতা কেবল একটি আসন জয় করার জন্য নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সংলাপ খুলার জন্য। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সকলের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
সূত্রঃ আল-জাজিরা
অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা