১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়ান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ ফেব্রুয়ারি- দীর্ঘ দেড় বছরের আন্দোলন-অস্থিরতার পর অবশেষে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ তাদের রায় স্পষ্টভাবে দিয়েছে। উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা স্বস্তির একটি পথ বেছে নিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছে। ৩০০ সদস্যের সংসদে তারা পেয়েছে ২১২টি আসন। বিএনপি একাই জিতেছে ২০৯টি আসনে। মোট ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ পেয়ে এটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়।
দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং কট্টর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। এর মধ্যে জামায়াত একাই জিতেছে ৬৮টি আসনে, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য। এর আগে ১৯৯১ সালে তারা সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল। এবার মোট ভোটের ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ পেয়েছে জামায়াত, এটিও তাদের ইতিহাসের সেরা ফল।
ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জনগণের সমর্থন পায়নি। তারা পেয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ ভোট। ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জিতেছে ৬টিতে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ৭টি আসন, যাদের সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। ইসলামী আন্দোলন পেয়েছে ১টি আসন। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে ভোট হয়নি। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল এখনো ঘোষিত হয়নি।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় গণতান্ত্রিক জোট প্রত্যাশিত ফল না পেলেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচন বর্জন করলেও পরে বিবৃতিতে বলেছে, নানা বাধা ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও জনগণ শান্তি ও সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। তারা বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধন নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। বিষয়টি কিছু উদ্বেগের কারণ হলেও মনে করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া সহজ হবে না। তবে জামায়াত নেতারা ইতিমধ্যে এ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।
এবারের নির্বাচনে নারী ও ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রার্থী মাত্র ৭ জন। ২০২৪ সালে ছিল ১৯ জন, ২০১৮ সালে ২২ জন, ২০১৪ সালে ১৮ জন। এবার মোট ৮৪ জন নারী প্রার্থী ছিলেন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা জিতেছেন ৪টি আসনে, সবাই বিএনপির। এটি গণতন্ত্রের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে অস্থিরতা বেড়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ‘তাওহিদি জনতা’ নামের ব্যানারে গণপিটুনি ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয় উগ্রবাদী হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রথিতযশা পত্রিকা কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। সুফি দরগা ভাঙচুর, বাউল নির্যাতন, এমনকি জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি পর্যন্ত ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাঙালি সংস্কৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। দেশকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের কথাও শোনা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কার্যত এক ধরনের গণরায় ছিল। প্রশ্ন ছিল, দেশ কি ১৯৭১-পূর্ব মানসিকতায় ফিরে যাবে, নাকি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধরে রাখবে।
বিএনপির বিজয়ে অনেকের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। মানুষ প্রমাণ করেছে, ধর্মীয় পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু তা উগ্রতায় রূপ নিতে হবে না। জামায়াতের বয়ানকে তারা পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ আরেকটি আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে পরিণত হতে চায় না। এই নির্বাচনের বড় তাৎপর্য এখানেই যে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারেনি। জামায়াতের ছায়ায় থাকা এনসিপিও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
তবে জামায়াতকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তারা ৭৭টি আসন নিয়ে সংসদে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছে। ছাত্র রাজনীতিতেও তারা প্রভাব বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, সারা দেশে প্রায় দুই কোটি সমর্থক রয়েছে।
এই নির্বাচন একটি নতুন গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করেছে। নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সত্যি, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবু জনগণের রায় স্পষ্ট— তারা স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার চায়। এই ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আগের নির্বাচনে ছিল ৪২ দশমিক ০৪ শতাংশ। তবু প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি। ফলে ম্যান্ডেট পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বমূলক বলা যায় না। যারা ভোট দিয়েছেন, তারা তাদের পছন্দের শক্তিকে ক্ষমতায় এনেছেন। কিন্তু যারা ভোট দেননি, তাদের আস্থাও ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা।
শুধু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যথেষ্ট নয়। নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতাও জরুরি। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। কৃষক সংকটে, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য মানুষের নাগালের বাইরে। মানুষ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চায়।
মানুষ বিশৃঙ্খলার বদলে স্থিতি চায়। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র চায়। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান চায়। গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা ও হয়রানি বন্ধ চায়। বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকদের মুক্ত পরিবেশ চায়। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
এই রায় শুধু বিজয় নয়, এটি দায়িত্ব। এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এগোবে, নাকি আরেকটি সুযোগ হারাবে, তা নির্ভর করছে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সরকার এবং দেশের সচেতন নাগরিকদের ওপর।
সূত্রঃ পিপলস ডেমোক্রেসি