চাঁদা দিয়েও বাঁচতে পারলেন না রঞ্জিত কুরী, লাশ মিলল হেঞ্জু মিয়ার পুকুরে
মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ- রঞ্জিত কুরী, তিপ্পান্ন বছরের এই হিন্দু ব্যক্তি প্রাণের ভয়ে চাঁদাও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেনি নিজেকে। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর…
মেলবোর্ন, ২১ ফেব্রুয়ারি-১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি। ঢাকার কাছে কালীগঞ্জের একটি স্কুলে ক্লাস ফোরের ছাত্র তখন তিনি। একদিন হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হলো। ছোটদের কাছে বিষয়টি ছিল অজানা। পরে জানা গেল, ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে মিছিলে গুলি চালানো হয়েছে, নিহত হয়েছেন ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। সেই ঘটনার প্রতিবাদেই স্কুল বন্ধ রাখা হয়।
ছুটির পর স্কুলের মাঠে এক সভা বসে। শিক্ষক ও সিনিয়র শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। সেখানেই প্রথমবারের মতো একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার কথা শোনেন তিনি। বয়স কম হলেও চারপাশের শোক ও উত্তেজনার আবহ তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
১৯৫২ সালের জুলাইয়ে পরিবারসহ ঢাকায় আসেন। নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর দেখেন, ভাষা আন্দোলনের রেশ তখনও প্রবল। পাড়ায় পাড়ায় বক্তৃতা, দেশাত্মবোধক গান ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চলত নিয়মিত। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান তখনও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। পরবর্তী বছরগুলোতে নানা রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হলেও ভাষা আন্দোলনের ধারা থেমে থাকেনি।
১৯৫৯ সালে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা আরও বাড়ে। ষাটের দশকে বর্তমান শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হলে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে মিছিল, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করেই হতে থাকে।
তিনি জানান, ওই সময় শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র সংগঠনগুলোর নানা কর্মসূচির জন্য পোস্টার, ফেস্টুন ও কার্টুন আঁকার দায়িত্ব পড়ত তাদের ওপর। ভাষা আন্দোলন যেমন কবি-সাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি শিল্পীদের মধ্যেও সৃষ্টিশীল উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে। শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ ও আব্দুল লতিফসহ অনেকে একুশে উপলক্ষে গণসংগীত পরিবেশন করতেন।
ষাটের দশক থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আলপনা আঁকার প্রচলন শুরু হয়। শাহবাগের চারুকলার গেট থেকে শহীদ মিনার এবং সেখান থেকে গোরস্তান পর্যন্ত সাদা-কালো রঙে আলপনা আঁকা হতো। তিন-চার দিন ধরে চলত প্রস্তুতি। শিল্পী গোলাম সরোয়ার মূল নকশা এঁকে দিতেন।
এ সময় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও ইমদাদ হোসেন শহীদ মিনারে বড় লাল সূর্যের প্রতীক ব্যবহারের প্রচলন করেন, যা পরে একুশের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি রাজনৈতিক আন্দোলন তীব্র হলে পোস্টার প্রোগ্রামও বাড়তে থাকে। কার্টুন আঁকার দক্ষতার কারণে তাকে দিয়ে অনেক পোস্টার আঁকানো হতো। সরকারি ঝুঁকি থাকায় কাজগুলো হতো গোপনে। এসব পোস্টার দেয়ালে সাঁটানোর জন্য নয়, মিছিলের মানুষের হাতে বহনের জন্য তৈরি করা হতো।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শহীদ মিনারকে আরও নতুনভাবে সাজানো হয়। বড় বড় পেইন্টিং, আদর্শলিপির অক্ষর ব্যবহার করে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা, খোলা প্রাঙ্গণে প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে শহীদ মিনার হয়ে ওঠে প্রতিবাদের শিল্পভাষা।
ভাষা আন্দোলন তখন শিল্পীদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মর্তুজা বশীর, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, মুস্তাফা মনোয়ার ও কামরুল হাসানসহ অনেকেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বড় ব্যানারে চিত্রকর্ম নির্মাণ করেন। এসব কাজ নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তিনি বলেন, তাদের সময়টা ছিল নিবেদন ও দায়বদ্ধতার। এখন প্রেক্ষাপট বদলেছে। আলপনা অনেক ক্ষেত্রে রুটিনের অংশ হয়ে গেছে, শহীদ মিনার ঘিরে উৎসবের আবহও তৈরি হয়। তবে ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী শক্তি এখনও অটুট।
তার মতে, একুশে ফেব্রুয়ারি এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচেতনার শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, যা পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে গড়িয়েছে।
১৯৫২ সালে যারা আহত বা নিহত হয়েছিলেন, যাদের অনেকের নাম ইতিহাসে নেই, তাদেরও স্মরণ করেন তিনি। তার ভাষায়, তারাও এই ইতিহাসের অংশ, এবং শহীদ মিনার সেই স্মৃতির নীরব সাক্ষী।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au