রাষ্ট্রপতিকে সরাতে তৎপর ছিলেন আসিফ নজরুল, মেলেনি প্রধান বিচারপতির সম্মতি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ ফেব্রুয়ারি- রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তার দুই বছরের বঙ্গভবন বন্দিদশার অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রপতি অপসারণের জন্য চলা নানা ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা ও তার অপসারণের প্রচেষ্টা দীর্ঘসময় ধরে চলেছিল, কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং দৃঢ় মনোবলের কারণে কোনো ষড়যন্ত্র সফল হতে পারেনি।
রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মূলত প্রধান বিচারপতিকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন অসাংবিধানিকভাবে তার স্থলে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য। তবে প্রধান বিচারপতি রাজি হননি। রাষ্ট্রপতি বলেন, “শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করা হয়েছে আমাকে উপড়ে ফেলার। রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তারা চেয়েছিল অসাংবিধানিকভাবে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানো। কিন্তু ওই বিচারপতি রাজি হননি এবং স্পষ্ট করে বলেছিলেন, আমি রাষ্ট্রপতি, সাংবিধানিকভাবে সবার উপরে, আমি অসাংবিধানিকভাবে এখানে বসতে পারি না।”
রাষ্ট্রপতি আরও জানান, প্রধান উপদেষ্টা তার সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করেননি। বিদেশ সফরসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিদেশ সফরে তার ছবি অপসারণ, হাইকমিশনে তার ছবি নামানো এবং প্রেস উইং কার্যত বন্ধ করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “এগুলো জনগণের কাছে আমার উপস্থিতি বন্ধ করার জন্য ছিল।”
দেড় বছরের এই অভিজ্ঞতা তার জীবনের অন্যতম কঠিন সময় ছিল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “একাকী অবস্থায় মনোবল অটুট রাখা কঠিন হতো যদি না বিভিন্ন মহল থেকে সমর্থন ও আশ্বাস পাওয়া যেত। তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছি। তারা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান; রাষ্ট্রপতির পরাজয় মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে এসে তাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেতর থেকেও একবার তাঁকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই সময়ও তিন বাহিনীপ্রধান তার পক্ষে অবস্থান নেন এবং সরকারের প্রধানকে জানান, কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তারা হতে দেবেন না। বঙ্গভবনে মব পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও সেনাবাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিএনপির সমর্থনকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাই এবং কোনো অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে নন। বিষয়টি পরবর্তী সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা এক অবস্থানে একত্রিত হয়েছেন।”
রাষ্ট্রপতি মনে করান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে তাঁকে অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে অপসারণের একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চাপ থেকে এসব তৎপরতা শুরু হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলার পরও পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, রাজনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেতর থেকে নতুন চেষ্টাও শুরু হয়। অসাংবিধানিকভাবে তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির স্থানে বসানোর চক্রান্ত হয়, তবে প্রধান বিচারপতির অনড় অবস্থান, সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় সমর্থন এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সব উদ্যোগই ব্যর্থ হয়। বঙ্গভবন ঘিরে বিক্ষোভ ও মব পরিস্থিতিও তৈরি হলেও সেনাবাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে রাখে।