মেলবোর্ন, ৫ মার্চ- দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক হিসেবে ফারুক ওয়াসিফ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। ব্যক্তি পর্যায়ের দুর্নীতি কীভাবে রাষ্ট্রের ভিত নষ্ট করে, অর্থনীতি ধ্বংস করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপদে ফেলে- এসব বিষয়ে তাঁর লেখায় ছিল তীব্র সতর্কবার্তা। কালোটাকার প্রভাব, ব্যাংক লুট, অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ব্যয়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা লুটপাটের সংস্কৃতি—এসব নিয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। সেই মানুষটিই এখন রাষ্ট্রীয় সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, পিআইবির মহাপরিচালক। আর তাঁর দায়িত্বকালেই প্রতিষ্ঠানটিতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া ভাউচারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পিআইবির কাজ সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রকাশনা ও গণমাধ্যম উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফারুক ওয়াসিফ মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ শিরোনামে চারটি কর্মসূচির নামে বিপুল অঙ্কের ব্যয়ের প্রস্তাব ও অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দেখানো এই কর্মসূচিগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা।
নথি অনুযায়ী, এই দুই দিনে দুটি সেমিনার, একটি সংগীতসন্ধ্যা এবং একটি চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেমিনার দুটিতে ২০০ জন করে মোট ৪০০ জন অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে সম্মানী বা ভাতা দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে আগতদের জন্য যাতায়াত ভাতা, আলোচকদের সম্মানী, ২৫০ প্যাকেট নাশতা এবং ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চের বিল সংযুক্ত রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের নাম, স্বাক্ষর ও ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্পসহ তালিকাও ফাইলে যুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। তালিকাভুক্ত অনেক সাংবাদিক, শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী জানিয়েছেন, তাঁরা ওই সেমিনারে অংশ নেননি, এমনকি অনুষ্ঠানের খবরও জানতেন না। একজন সাংবাদিকের নাম তালিকায় পাওয়া যায়, যিনি প্রায় দুই বছর আগে দেশ ছেড়েছেন। তাঁর নামে ভাতা উত্তোলনের স্বাক্ষরও রয়েছে। দেশে ফিরে তিনি নথি দেখে স্পষ্ট জানান, স্বাক্ষরটি জাল। এ ধরনের অন্তত ৭০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করে একই তথ্য পাওয়া যায়। কেউ বলেন, তাঁরা কখনো ওই সেমিনারে যাননি। কেউ বলেন, কোনো ভাতা নেননি। অধিকাংশই স্বাক্ষর জাল বলে দাবি করেন এবং নিজেদের প্রকৃত স্বাক্ষরের নমুনা দিয়ে অসঙ্গতির প্রমাণ দেন।
শুধু অংশগ্রহণকারী নন, আলোচক হিসেবে যাঁদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যেও কয়েকজন সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে, সেখানে ওই নামে কোনো কর্মীই নেই। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত নাম, পদবী ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুরুতর অসামঞ্জস্য রয়েছে।
ব্যয়ের ভাউচার ঘেঁটে আরও অসঙ্গতি সামনে আসে। আলোকচিত্র বাঁধাইয়ের নামে একই মেমো নম্বরে দুটি আলাদা বিল সংযুক্ত রয়েছে। ডেকোরেশন, সাউন্ড সিস্টেম, মঞ্চ প্রস্তুতি—বিভিন্ন খাতে বিল দেখানো হয়েছে। ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চের জন্য আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ের উল্লেখ আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ জানান, এত দামের প্যাকেট তারা সরবরাহ করে না। তাদের ব্যবহৃত ভাউচার রঙিন হলেও জমা দেওয়া কপিটি সাদাকালো। স্বাক্ষরও মেলে না। নাশতার বিলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায়। কয়েকটি দোকান কর্তৃপক্ষ বলেন, মাঝে মাঝে কেউ খালি ভাউচার নিয়ে যায়, পরে সেগুলো কীভাবে ব্যবহার হয়, তা তাদের জানা নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কথিত ৪০০ অংশগ্রহণকারী নিয়ে অনুষ্ঠিত সেমিনারের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ নেই। পিআইবির নিজস্ব ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আয়োজনের ছবি বা প্রতিবেদন নেই। অথচ ছোট আকারের প্রশিক্ষণ কর্মশালার ছবিও সেখানে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। পিআইবির ভবন পরিদর্শনে দেখা যায়, একসঙ্গে ২০০ জনের সেমিনার আয়োজনের মতো বড় কক্ষ সেখানে সীমিত। প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই দুই দিনে এমন বড় কোনো সেমিনার হয়নি।
নথিতে দেখা যায়, ব্যয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন পিআইবির এক সিনিয়র কর্মকর্তা গোলাম মুর্শেদ এবং মহাপরিচালক হিসেবে ফারুক ওয়াসিফ অনুমোদন দিয়েছেন। পরবর্তীতে ব্যাংকের চারটি চেকের মাধ্যমে মোট ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়। ব্যাংক লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ বিলের অঙ্কের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে ফারুক ওয়াসিফ দাবি করেন, একটি ভুয়া বিল তৈরি হলেও তিনি সেটি অনুমোদন দেননি এবং কোনো টাকা খরচ হয়নি। তাঁর বক্তব্য, অনেক ফাইলে স্বাক্ষর করতে হয়, কোনো ফাইলে স্বাক্ষর পড়ে গেলেও পরে তিনি তা বাতিল করেছেন। তবে ব্যাংক থেকে সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ইঙ্গিত দেন, ঊর্ধ্বতন নির্দেশ ছাড়া এত বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় সম্ভব নয়।
যিনি লেখালেখিতে বারবার বলেছেন ব্যক্তি দুর্নীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই আঘাত হানে, যিনি সততা ও জবাবদিহির কথা উচ্চারণ করেছেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে যদি জাল স্বাক্ষর, ভুয়া অংশগ্রহণকারী তালিকা ও সন্দেহজনক ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে, তবে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়। এটি নৈতিকতার প্রশ্নও। যে মানদণ্ড তিনি অন্যদের জন্য দাবি করেছেন, এখন সেই মানদণ্ডেই তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করার সময় এসেছে।
সূত্রঃ কালের কন্ঠ