ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ মার্চ- বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নরের নিয়োগ বাতিল এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র ঘোষণা শুধু জনসমক্ষে উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, তা সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও কঠোরভাবে প্রতিফলিত হতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধে একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। টিআইবির মতে, এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ও কার্যকর নজরদারি ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তার ভাষায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। সেখানে নেতৃত্বের অবস্থানে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি স্বার্থসংঘাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের নিয়োগের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পুনরায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। এটি রাষ্ট্র ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ কারণে বর্তমান নিয়োগ বাতিল করে সৎ, অভিজ্ঞ এবং স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনে সক্ষম ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল সাধারণ জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এ বার্তা প্রথমে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ভেতরে পৌঁছাতে হবে।
তার মতে, মন্ত্রিপরিষদ, সংসদ সদস্য এবং দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের অভ্যন্তরীণ চর্চায় এই অবস্থান প্রতিফলিত না হলে জনসাধারণের কাছে বার্তাটি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাবের কঠোর সমালোচনা করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, আগে অন্যরা দুর্নীতি করেছে বলে এখন নিজেদের কর্মীরা একই পথে হাঁটবে—এমন মানসিকতা বিপজ্জনক।
রাজনৈতিক বা সরকারি অবস্থানকে যেন দুর্নীতির লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা না হয়, সে জন্য দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি নিজ দলের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ বা স্বার্থান্বেষী মহলের ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলোই শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো জরুরি বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।