ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে সশস্ত্র রোবট, প্রযুক্তিনির্ভর লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আকাশজুড়ে গুপ্তচর ও হামলাকারী ড্রোনের ঝাঁক নিয়মিত উড়তে দেখা যাচ্ছে, আর মানববিহীন নৌযান কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। এবার যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে স্থলভাগে সশস্ত্র রোবট মোতায়েনের বড় কর্মসূচি শুরু করেছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনীয় সামরিক পরিভাষায় যেগুলোকে ‘আনক্রুড গ্রাউন্ড ভেহিকল’ বা স্থলভিত্তিক মানববিহীন যান বলা হয়, সেসব রোবট ইতিমধ্যে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব রোবট ব্যবহার করে রুশ বাহিনীর হামলা প্রতিহত করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে শত্রু সেনাদের আটক করতেও সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। এমনকি এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই ইউক্রেন ও রাশিয়ার রোবটের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কে-টু ব্রিগেডের কর্মকর্তা ওলেক্সান্দর আফানাসিয়েভ বলেন, “রোবটের যুদ্ধ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।” তিনি জানান, তার ব্রিগেডের অধীনে বিশ্বের প্রথম মানববিহীন স্থলযান ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়েছে।
এই রোবটগুলো ব্যবহারের একটি পদ্ধতি হলো এর ওপর কালাশনিকভ মেশিনগান বসানো। আফানাসিয়েভ বলেন, “যে যুদ্ধক্ষেত্রে একজন পদাতিক সৈনিক যেতে ভয় পায়, সেখানে এই রোবট গুলি চালাতে পারে। রোবট নিজের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে ফেলতে দ্বিধা করে না।”
তার ব্যাটালিয়ন বিস্ফোরকবোঝাই ব্যাটারিচালিত কামিকাজে রোবটও ব্যবহার করছে, যেগুলো শত্রুর ঘাঁটি ও অবস্থান ধ্বংস করতে সক্ষম। আকাশের ড্রোনের মতো এগুলো কোনো শব্দ করে না, ফলে হামলার আগাম সতর্কতা পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
ইউক্রেনের ৩৩তম পৃথক যান্ত্রিক ব্রিগেডের ট্যাংক ব্যাটালিয়নের উপকমান্ডার, যিনি ‘আফগান’ ছদ্মনামে পরিচিত, জানান যে একবার একটি মেশিনগানসজ্জিত ইউক্রেনীয় রোবট রুশ বাহিনীর একটি সাঁজোয়া যানকে অতর্কিত হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। অন্য একটি রোবট কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ইউক্রেনীয় অবস্থান রক্ষা করেছিল।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এসব হত্যাকারী রোবটের স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কারণে ইচ্ছাকৃতভাবেই সেই সীমা রাখা হয়েছে। তার ভাষায়, আধুনিক রোবটগুলো আংশিক স্বয়ংক্রিয়। তারা নিজে চলাচল করতে পারে, শত্রুকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের হাতেই থাকে।

আধুনিক রোবটগুলো আংশিক স্বয়ংক্রিয়। তারা নিজে চলাচল করতে পারে, শত্রুকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের হাতেই থাকে।
তিনি বলেন, রোবট ভুল করে অন্য কাউকে শত্রু মনে করতে পারে কিংবা বেসামরিক নাগরিকের ওপর হামলা চালাতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একজন অপারেটরেরই নিতে হয়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সশস্ত্র রোবট নিরাপদ দূরত্বে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অপারেটররা নিয়ন্ত্রণ করেন।
ইউক্রেনের এসব রোবটে মেশিনগানের পাশাপাশি গ্রেনেড নিক্ষেপকও বসানো যায়। এছাড়া এগুলো দিয়ে স্থলমাইন পুঁতে রাখা কিংবা কাঁটাতারের বাধা তৈরি করার কাজও করা সম্ভব। তবে এখনো অধিকাংশ মানববিহীন স্থলযান মূলত সরঞ্জাম পরিবহন ও আহত সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি মনে করেন, ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে এসব সশস্ত্র রোবটের ভূমিকা দ্রুত বাড়বে। লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শুধু একক রোবট নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বড় বড় ড্রোনের ঝাঁকের অংশ হিসেবেও এসব রোবট ব্যবহৃত হবে।
তার মতে, খুব শিগগিরই আকাশ, স্থল ও সমুদ্র থেকে একযোগে বিভিন্ন দিক থেকে শত শত স্বল্পমূল্যের কিন্তু বুদ্ধিমান ড্রোন আক্রমণ চালাতে দেখা যাবে।
এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পেছনে বড় কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা। আকাশে ড্রোনের আধিপত্যের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি এখন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে ইউক্রেনের তথাকথিত ‘হত্যা অঞ্চল’ বা বিপজ্জনক এলাকা যুদ্ধরেখা থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
আফানাসিয়েভ বলেন, পদাতিক সেনা কখনোই পুরোপুরি প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। তবে তাদের সহায়তায় এসব রোবট প্রয়োজন। তার মতে, ইউক্রেন রোবট হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সৈন্য হারানোর সামর্থ্য তাদের নেই।
ইউক্রেনীয় বাহিনী বর্তমানে জনবলের ঘাটতির মুখে পড়েছে। নিহত সেনাদের জায়গায় নতুন সৈন্য নিয়োগ করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও নিজস্ব যুদ্ধ রোবট তৈরি করছে। এর মধ্যে ‘কুরিয়ার’ নামের একটি রোবট রয়েছে, যা আগুন নিক্ষেপকারী অস্ত্র ও ট্যাংকে ব্যবহৃত ভারী মেশিনগান বহন করতে পারে এবং পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম। রুশ বাহিনী ‘লিয়াগুশকা’ বা ‘ব্যাঙ’ নামে কামিকাজে যানও ব্যবহার করছে, যা ইউক্রেনীয় অবস্থান ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডেভড্রয়েডের প্রধান নির্বাহী ইউরি পোরিৎসকি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ ও ইউক্রেনীয় রোবটের সরাসরি সংঘর্ষ সময়ের ব্যাপার মাত্র। গত বছর তার প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীর জন্য শত শত হামলাকারী রোবট তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, “শিগগিরই এমন পরিস্থিতি আসবে যখন আমাদের হামলাকারী রোবটের মুখোমুখি হবে তাদের হামলাকারী রোবট। রোবট যুদ্ধ শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এটি এখন বাস্তবতা।”
তার প্রতিষ্ঠান এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে যাতে অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারে। ভবিষ্যতে তারা এমন রোবট তৈরি করতে চায় যেগুলো নিজে নিজে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে নজরদারি চালাবে, প্রয়োজনে শত্রুর ওপর হামলা করবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ঘাঁটিতে ফিরে আসবে।
ইউক্রেনের আরেক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেনকোরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তারা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর জন্য দুই হাজারের বেশি স্থলভিত্তিক রোবট তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাকসিম ভাসিলচেঙ্কো মনে করেন, ২০২৬ সালে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় চল্লিশ হাজারে পৌঁছাতে পারে এবং এর অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হবে সশস্ত্র।
তার মতে, হামলাকারী রোবট খুব শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠবে। আরও দূর ভবিষ্যতে মানুষের মতো আকৃতির রোবট সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নিতে পারে, তখন সেটি আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় থাকবে না।
সূত্রঃ বিবিসি