বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- ক্ষমতার প্রথম বছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় মেটাতে বিদেশ থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে ইউনূস সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবর্তে পরিচালন ব্যয়ের জন্য এত বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ নেওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
রবিবার (৮ মার্চ) একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা মূলত সরকারি পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যয় করা হয়েছে। এই ব্যয়ের বড় অংশই গেছে সাধারণ সরকারি সেবায়, যার মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য চলতি ব্যয় অন্তর্ভুক্ত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাধারণত বিদেশি ঋণ উন্নয়ন প্রকল্প বা অবকাঠামোগত খাতে ব্যবহার করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়। কিন্তু পরিচালন ব্যয় বা বেতন-ভাতা পরিশোধের মতো খাতে বিদেশি ঋণ ব্যবহার করলে তা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোট প্রায় ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বাজেট সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারই নেওয়া হয়েছে ইউনূস সরকারের সময়, যা মোট বাজেট সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
ইআরডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৯ শতাংশের সমান। আপাতদৃষ্টিতে এই হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের ব্যবহার ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশকে ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে অতিরিক্ত ঋণ ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে ঋণ ফাঁদের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ওই সময় সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছিল। ফলে যে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক অর্থায়ন এসেছে, তার একটি বড় অংশই বাজেট সহায়তা হিসেবে এসেছে।
তিনি বলেন, “এই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাজেট সহায়তা চুক্তি করা হয়। এর ফলে ওই অর্থবছরে প্রায় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে।”
ড. রিয়াজের মতে, সরকারের হাতে অর্থ একেবারেই ছিল না, বিষয়টি এমন নয়। বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে দ্রুত স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তাও এই সিদ্ধান্তের একটি বড় কারণ ছিল।
তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে বিদেশি ঋণের ব্যবহার আরও সতর্ক ও পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। বিশেষ করে উন্নয়নমূলক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিচালন ব্যয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।