২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ট্যাংকার, আরও আসবে চারটি
মেলবোর্ন, ৯ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর ১০ দিনের মাথায় ২৭ হাজার টনের বেশি ডিজেল নিয়ে একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে। আজ সোমবার সিঙ্গাপুর থেকে…
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত নির্বাচনী প্রচারে বারবার একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—তিনি যুদ্ধ বন্ধ করবেন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দেওয়া ভাষণেও তিনি একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। কিন্তু বাস্তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর মাত্র ১৪ মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অন্তত নয়টি বিদেশি সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সাতটি বিদেশি দেশ এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প নিজে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও তার প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি সমর্থন বা বিরোধিতা না করে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এ বছর ট্রাম্প প্রশাসন একটি নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলও প্রকাশ করে, যেখানে আর্কটিক অঞ্চল থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়। তবে ট্রাম্পের অধিকাংশ সামরিক অভিযানই এই অঞ্চলের বাইরে সংঘটিত হয়েছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে পরিচালিত প্রধান সামরিক অভিযানগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে।
ভেনেজুয়েলা
২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের খবর প্রকাশ পায়। উত্তর ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালানোর পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সেনারা। ছবি: সংগৃহীত
কোনো দেশের ক্ষমতাসীন নেতাকে সরাসরি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অপসারণ করা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একেবারে নতুন নয়। ১৯৮৯ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আমলে পানামার বাস্তবিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
মাদুরোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তি দেখাতে পারে যে, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে তারা তাকে ভেনেজুয়েলার বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
এই ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়া সরকার আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে অপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করে। দেশটির অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাদের পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তুলনামূলক কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
সিরিয়া
সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডানের যৌথ বাহিনী সিরিয়ার মধ্যাঞ্চলে ৭০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। “অপারেশন হকআই স্ট্রাইক” নামে পরিচিত এই হামলা পালমিরা শহরে এক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে চালানো হয়। ওই হামলায় দুইজন মার্কিন সেনা এবং একজন বেসামরিক দোভাষী নিহত হন।

বেকা উপত্যকা, বালবেক, জিজিন, ঘাজিয়েহ, ব্রিটাল, নাসিরিয়া, মাহমুদিয়া ও খারদালি এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। ছবিঃ আল জাজিরা
যদিও ট্রাম্প আইএসকে দায়ী করেন, সিরিয়ার কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে হামলাটি সিরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক অসন্তুষ্ট সদস্য চালিয়েছিল।
তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হামলাকে “প্রতিশোধের ঘোষণা” বলে উল্লেখ করেন।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এই অভিযানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আইএস একটি উগ্র ও সহিংস সংগঠন, যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র হামলা, ছবিঃ সংগৃহীত
২০২৫ সালের বড়দিনে নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে আইএস–সম্পর্কিত লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়ার যৌথ বিমান হামলা চালানো হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ডের জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে নাইজেরিয়া সরকার এই দাবি অস্বীকার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটিতে সন্ত্রাসী সহিংসতার পেছনে ধর্মীয় উপাদান থাকলেও পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল, এবং মুসলিমরাও সমানভাবে সহিংসতার শিকার হন।
ট্রাম্প ধর্মীয় প্রসঙ্গকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, খ্রিস্টানদের হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে আরও সন্ত্রাসী নিহত হবে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়ার সহযোগিতাকে সমর্থন জানিয়েছে।
প্রশান্ত ও ক্যারিবীয় সাগরে নৌকা লক্ষ্য করে হামলা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌযানের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস ফোর্ড ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন রয়েছে, যেখানে রয়েছে অসংখ্য উন্নত যুদ্ধবিমান।
(US Navy: Seaman Abigail Reyes via Reuters)
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী এ ধরনের ৪৪টি হামলায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছেন।
যদিও মাদক পাচারকারী নৌযান আটক করা নতুন নয়, আগে এসব অভিযান সাধারণত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতো।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, এসব নৌযান সন্ত্রাসী সংগঠন পরিচালনা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মাদকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা এসব হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকের মতে এগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যার শামিল হতে পারে।
ইরান (২০২৫)
২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে চালানো এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু বছর পিছিয়ে গেছে বলে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই হামলা জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হতে পারে।
সোমালিয়া
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ায় আল-শাবাব ও আইএস–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছে।

সোমালিয়ার আইসিস নেতা আব্দুল কাদির মুমিন এবং তার অধিনস্ত সেনা। ছবি: ওপেন সোর্স ইন্টেল
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এসব অভিযানের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালেই সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩৬টি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
ইরাক
২০২৫ সালের মার্চে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র আইএসের একজন শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে নির্ভুল বিমান হামলা চালায় এবং তাকে হত্যা করে।
ইরাক সরকার আইএস পরাজিত হয়েছে দাবি করলেও সংগঠনটি এখনো সেখানে সক্রিয় রয়েছে।

মার্কিন বিমান হামলায় জ্বলছে ইয়েমেনের রাস ইসা তেলবন্দর। ছবি: আল-জাজিরা
ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে বিমান হামলা শুরু হয় আগের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর “অপারেশন রাফ রাইডার” নামে এই অভিযান আরও জোরদার করা হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও এই অভিযান প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
ইরান (২০২৬)
সবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় আকারের হামলা চালায়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এটি সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক অভিযান।

ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা। ছবিঃ সংগৃহীত
অনেক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবৈধ আগ্রাসন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত বিজয়ের আশা করছে।
ইরানে সরকার পরিবর্তন এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প ইরানের জনগণকে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বানও জানিয়েছেন।
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এত সহজে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৭ থেকে ৪১ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ম্যাট গেটজ একবার সতর্ক করে বলেছিলেন, “শুরুতে প্রায় সব সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধই জনপ্রিয় থাকে, কিন্তু ইতিহাস বলে এর পরিণতি ভালো হয় না।”
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au