নতুন করে টাকা ছাপানো শুরু করেছে সরকার: পিআরআই
মেলবোর্ন, ২৩ এপ্রিল- সরকার নতুন করে টাকা ছাপানো শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, মার্চ…
মেলবোর্ন, ২৩ এপ্রিল- দেশ ও দেশের বাইরে বিস্তৃত একাধিক বড় আকারের আর্থিক অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপ সংশ্লিষ্ট প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদ বর্তমানে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
দুদক ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় টাস্কফোর্সের অধীনে পরিচালিত দীর্ঘ অনুসন্ধান ও একাধিক পৃথক মামলার ভিত্তিতে এই সম্পদগুলো ফ্রিজ করা হয়। এখন পর্যন্ত মোট ২৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে দুদক ১১টি এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৭টি মামলা করেছে। এসব মামলার ভিত্তিতে আদালত সংশ্লিষ্ট সব সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়, যাতে কোনো সম্পদ হস্তান্তর, বিক্রি বা স্থানান্তর করা না যায়।
দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জব্দ বা অবরুদ্ধ সম্পদের তথ্য কমিশনকে জানানো এবং সেগুলো সুরক্ষিত রাখা তাদের প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, “আমাদের মূল কাজ হলো জব্দকৃত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ যেন কোনোভাবেই হস্তান্তর না হয় তা নিশ্চিত করা। তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।”
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রিজ করা সম্পদের তালিকা অত্যন্ত বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০৭টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা, ৯৪টি কোম্পানির শতভাগ শেয়ার, প্রায় ১ হাজার ৯৭০ দশমিক ৪৬৭ শতাংশ জমি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
দুদকের উপ-পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি জাতীয় টাস্কফোর্স বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে এই বিস্তৃত দুর্নীতি অনুসন্ধান পরিচালনা করছে। তদন্তে এখন পর্যন্ত ১১টি মামলা হয়েছে এবং আরও প্রায় এক ডজন মামলার প্রস্তুতি চলছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু দেশীয় নয়, বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাজ্যে সালমান এফ রহমানের পরিবারের নামে দুটি ফ্ল্যাটের সন্ধান। এসব সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে দুদক ইতোমধ্যে দুটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে।
হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির একাধিক মামলা
২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর দুদক বেক্সিমকো গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে পাঁচটি পৃথক মামলা করে। অভিযোগে বলা হয়, রপ্তানি বাণিজ্যের নামে ভুয়া এলসি তৈরি করে এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ৯৩৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
এই মামলাগুলোতে সালমান এফ রহমান, তার ভাই, দুই ছেলে, বেক্সিমকো গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাসহ মোট ৩৪ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন গার্মেন্টস ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খুলে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে পিয়ারলেস গার্মেন্টস, প্লাটিনাম গার্মেন্টস, কাঁচপুর অ্যাপারেলস, স্কাইনেট অ্যাপারেলস এবং ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মাধ্যমে পৃথকভাবে কোটি কোটি ডলার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের ৩ জুন আরও একটি বড় মামলা হয়, যেখানে প্রায় ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। মামলার বিবরণে বলা হয়, অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে এবং জাল সাব-কন্ট্রাক্ট চুক্তির মাধ্যমে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলায় সালমান এফ রহমান, তার ছেলে, ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ মোট ৩৯ জনকে আসামি করা হয়।
দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের মার্চ ও জুন মাসে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা বিতরণ করা হয়, যা পরে বিভিন্ন খাতে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তা সুদ-আসলে প্রায় ৬৭৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
দুদকের একাধিক মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আইএফআইসি ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ব্যাংকের আইটি, ক্রেডিট, ট্রেজারি এবং অপারেশন বিভাগে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তার নামও মামলার এজাহারে রয়েছে।
অন্যদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোজি অ্যাপারেলসসহ একাধিক কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঋণ তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাস্তবে ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আরও একটি বড় মামলা হয়, যেখানে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বন্ড বিনিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, অতিমূল্যায়িত সম্পদ ও জাল জামানত ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আরও একটি মামলায় প্রায় ১৩৬ কোটি টাকার আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এতে বলা হয়, এলসি ও ভুয়া ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়, যা পরে বিভিন্ন মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে দুদকের হিসাব অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরণের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিপুল সম্পদ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে দুটি ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন আর্থিক সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশে জব্দ করা সম্পদ রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে রয়েছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো হস্তান্তর বা ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে এসব সম্পদ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়াও বিবেচনায় রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au