ঢাবিতে তোফাজ্জল হত্যা: ২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ মার্চ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত। আসামিদের মধ্যে ২২ জন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর হাকিম জুয়েল রানা অভিযোগপত্র গ্রহণ করে এই আদেশ দেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ এবং ওয়াজিবুল আলম বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। জালাল মিয়া, আল হোসাইন সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ এবং সুমন মিয়া কারাগারে আছেন। বাকি ২২ আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মামলার অভিযুক্তরা হলেন জালাল মিয়া, আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ, আল হোসাইন সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ, সুমন মিয়া, ওয়াজিবুল আলম, ফিরোজ কবির, আব্দুস সামাদ, সাকিব রায়হান, ইয়াছিন আলী, ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম, ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান, রাতুল হাসান, সুলতান মিয়া, নাসির উদ্দিন, মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি, আব্দুল্লাহিল কাফী, শেখ রমজান আলী রকি, রাশেদ কামাল অনিক, মনিরুজ্জামান সোহাগ, আবু রায়হান, রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ, রাব্বিকুল রিয়াদ এবং আশরাফ আলী মুন্সী।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক জিন্নাত আলী জানিয়েছেন, মামলার বাদী মোহাম্মদ আমানুল্লাহ প্রথমে অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত আদালতে কোনো নারাজি আবেদন দাখিল করেননি। ফলে আদালত ২৮ জন আসামির বিরুদ্ধে পিবিআইয়ের দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং পলাতক ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল এলাকায় তোফাজ্জল হোসেন নামে ৩২ বছর বয়সী এক যুবককে চোর সন্দেহে আটক করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যার দিকে তাকে হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটক করে প্রথমে হলের মূল ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তার বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ এনে তাকে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি নিজের নাম তোফাজ্জল বলে জানান।
পরে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন যে ওই যুবক মানসিক ভারসাম্যহীন। এরপর তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মারধরের আগে তাকে ভাত খেতে দেওয়া হয় এবং তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় খাবার খেতে তার কেমন লাগছে। এরপর তাকে আবার হলের দক্ষিণ ভবনের একটি অতিথি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে জানালার সঙ্গে তার হাত বেঁধে কিছু শিক্ষার্থী তাকে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে রাত প্রায় ১২টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগ থানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ জন শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
তবে তদন্ত সঠিকভাবে হয়নি অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করে। পরে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে নির্দেশ দেন।
পরে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম নতুন করে তদন্ত সম্পন্ন করে গত ১৫ ডিসেম্বর আদালতে সংশোধিত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। নতুন অভিযোগপত্রে আগের আসামিদের পাশাপাশি আরও সাতজনকে যুক্ত করে মোট ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
নিহত তোফাজ্জল হোসেনের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তবে মানসিক সমস্যার কারণে তিনি কোনো পেশায় যুক্ত ছিলেন না বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ঘটনার কয়েকদিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর নিহত তোফাজ্জলের ফুফাতো বোন আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মাসুমসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। আদালত ওই মামলার বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে সেটিকেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলার সঙ্গে একসঙ্গে তদন্ত করার নির্দেশ দেন।