ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ মার্চ- বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। তিনি ভারতের প্রভাবশালী সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকা-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে এবং এর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই নিবন্ধে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অন্তর্বর্তীকালীন টালমাটাল সময় পার হওয়ার পর একটি নির্বাচিত সরকারের উত্থান বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় পারস্পরিক আস্থার পরিবেশও পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নিবন্ধে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা তারেক রহমান ভারতের বিষয়ে তুলনামূলক ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। যদিও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে অভিজ্ঞতা ছিল তা অনেকের মনে এখনও প্রভাব ফেলতে পারে, তবুও পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় অতীতের সেই অভিজ্ঞতা নতুন বাস্তবতার সামনে নতুনভাবে মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন।
হর্ষবর্ধন শ্রিংলা আরও উল্লেখ করেন, একবিংশ শতকের শুরু থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে ভারত এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, কয়েক বছর ধরে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর বাংলাদেশ বর্তমানে কিছু অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত চার বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ছিল, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে নিবন্ধে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বিএনপি শুধু নির্বাচনী সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে নাকি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে তার ওপর। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ৭০টির বেশি আসনে জয় পেয়েছে এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক দলও একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও নির্বাচনে তাদের ফল প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত ছিল, তবুও তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মনে করেন, আগামী সময়েই বোঝা যাবে বিএনপি তাদের নির্বাচনী সাফল্যকে কতটা কার্যকর শাসনব্যবস্থায় রূপ দিতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য যেমন বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক সূচক স্থিতিশীল করা এবং বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণ করা, এসব লক্ষ্য পূরণ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নবনির্বাচিত নীতিনির্ধারকদের জন্য ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি একটি বাস্তবসম্মত ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা, আন্তসীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, ভারতের জন্যও ঢাকার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় কৌশলগত বাস্তববাদ এবং কূটনৈতিক সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, সম্পর্ক যখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে তখন আন্তসীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে যৌথ উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিবন্ধে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে কোনো অবস্থাতেই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শত্রুতামূলক পরিকল্পনার সহযোগী হতে দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আস্থা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলায় আন্তরিকতা দেখায়, তবে ভারতের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা ও সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেওয়া স্বাভাবিক হবে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন আস্থার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা