গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহতের খবর নিশ্চিত করল ইরান
মেলবোর্ন, ১৯ মার্চ- ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। টানা দুই দিনে এটি তৃতীয়বারের মতো…
মেলবোর্ন, ১৯ মার্চ- বাংলাদেশে তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে শপথ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সরকার। দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় ফিরে আসা এই রাজনৈতিক শক্তির প্রথম এক মাসকে ঘিরে তাই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্বল্প সময় হলেও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ, সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করে অনেকে ভবিষ্যৎ শাসনধারার একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রথম মাসে সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে একদিকে যেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক নিয়োগ, কূটনৈতিক আচরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সমালোচনাও সামনে এসেছে। ফলে এই এক মাসকে কেউ কেউ সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ দেখছেন পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবিঃ বিএনপি মিডিয়া সেল
ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিএনপির এই ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুহাম্মদ ইউনূস। তার নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রায় সতেরো বছর বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেন তারেক রহমান। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দলকে সংগঠিত করে নির্বাচনে জয়লাভ এবং সরকার গঠন—সব মিলিয়ে এটি বিএনপির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পুনরুত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা
সরকারের প্রথম মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী অনেক সরকার প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করলেও এবার সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার পরিকল্পনার কথা বলেছে। যদিও এই পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে এর আংশিক প্রতিফলন দেখা গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ভবিষ্যতে এটি চার কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
এই কর্মসূচিকে অনেকেই সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি স্বস্তির বার্তা বহন করছে। তবে অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় পরিসরের একটি কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে চালানো সম্ভব হবে কি না এবং এর অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে তারেক রহমান। ছবিঃবিবিসি
কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন
সরকার কৃষি খাতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যা কৃষকদের সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা হয়েছে। দিনাজপুরে এই কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্য সামনে এনেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির রাজনীতি আবার ফিরিয়ে আনল বিএনপি। ছবিঃ সংগৃহীত
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে এসব উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না—এমন সতর্কতাও রয়েছে।
অর্থনীতি: ইতিবাচক উদ্যোগ, কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক দিক থেকে সরকার কিছু ইতিবাচক বার্তা দিলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো চ্যালেঞ্জপূর্ণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব—এই তিনটি বড় সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো না গেলে সরকারের ব্যয়ভার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একজন দল-সমর্থিত ব্যবসায়ীকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে। এতে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কূটনীতি: ভারসাম্যের চেষ্টা
নতুন সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি গ্রহণের কথা বলেছে। এর মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে যোগাযোগ, শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ববর্তী চুক্তি, বাণিজ্য শর্ত এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক চাপ—এসব বিষয় সরকারকে সতর্কভাবে সামাল দিতে হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে ভারত সরকারের শোকবার্তা তুলে দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ছবিঃ বিবিসি
কূটনৈতিক বিতর্ক
সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপের মধ্যে কিছু বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা যেভাবে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপে পেশাদার কূটনৈতিক আচরণের অভাব দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতে কূটনীতিকদের মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। ১১টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৪২টি জেলায় এই ধরনের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় সমর্থক শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়াও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এসব সিদ্ধান্ত প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রবণতা আরও বাড়াবে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং নতুন আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সরকার।
তবে নির্বাচনের আগে যে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল, তা কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এ বিষয়ে সরকারের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘোষিত সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গণভোটে সমর্থন পাওয়ার পরও পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে সরকার অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
সরকারের অবস্থান হচ্ছে, সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করা হবে। এতে করে পূর্বঘোষিত সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিরোধী দল
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর ভবিষ্যৎ একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
এখন নতুন সরকার এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন–এর পদে পরিবর্তন আনা হবে কি না, সেটিও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবুও এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়ান। ছবিঃ সংগৃহীত
সার্বিক মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম এক মাস একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, কৃষি উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তা ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক নিয়োগ, দলীয়করণ এবং কিছু কূটনৈতিক আচরণ নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই এক মাস মূলত সরকারের দিকনির্দেশনার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের কার্যকারিতার ওপর।
আগামী মাসগুলোতে সরকার কীভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা সফল হয়—সেটিই নির্ধারণ করবে এই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য বা ব্যর্থতা।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au