অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- রাজশাহীর তানোরে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে গীতা পাঠকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি উপজেলা প্রশাসনকে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সেই নির্দেশনা না মেনে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুসরণ করে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি গীতা পাঠের মাধ্যমেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
বিষয়টি বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছেন তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান। তিনি জানান, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে এবং গীতা পাঠ করা যাবে না—এমন নির্দেশনা কয়েকদিন আগে মোবাইল ফোনে তাকে দিয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
ইউএনও নাঈমা খানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নির্দেশনা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করার প্রচলিত রীতি বজায় রাখা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
এরপর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালন উপলক্ষে তানোর উপজেলা সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিষয়টি আবারও সামনে আসে। ওই সভায় উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলমগীর হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে ইউএনও নাঈমা খান সরাসরি উপজেলা জামায়াতের আমিরকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “এমপি স্যার তো গীতা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন, তাহলে আমরা কী করব?” এই প্রশ্নের জবাবে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলমগীর হোসেন জানান, রাষ্ট্রীয় নিয়মে যা নির্ধারিত রয়েছে, সেটিই অনুসরণ করতে হবে। তার এই বক্তব্যের পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের মূল অনুষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি গীতা পাঠও অনুষ্ঠিত হয়। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পালনের যে রীতি রয়েছে, সেটিই বজায় রাখা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলমগীর হোসেন বলেন, বিষয়টি যেভাবে প্রচার হচ্ছে, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। তার দাবি, সংসদ সদস্য এভাবে সরাসরি গীতা পাঠ নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি। বরং তিনি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ না করার বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন। স্বাধীনতা দিবসের মতো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ না করার নির্দেশ দিয়েছেন—এমন দাবি সঠিক নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান তার বক্তব্যে অটল রয়েছেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য তাকে সরাসরি ফোন করে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হওয়ায় সেটি রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ীই পালন করতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়মেই পালন করতে হবে। তাই কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি গীতা পাঠের মাধ্যমেই আমরা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছি।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতিফলন থাকা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে প্রচলিত নিয়ম বজায় রাখা উচিত।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দিবসের মতো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করার একটি ঐতিহ্য রয়েছে, যা দেশের ধর্মীয় সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে তানোরের এই ঘটনা নতুন করে সেই আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে, স্বাধীনতা দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে ঘিরে গীতা পাঠ নিয়ে এই বিতর্ক প্রশাসন, রাজনীতি এবং সামাজিক পরিসরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পরিষ্কার নীতিমালা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।