মধ্যপ্রাচ্যে সেনা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, স্থল অভিযানের আশঙ্কায় প্রস্তুত ইরান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- ইরান জানিয়েছে, সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র, যা অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বললেও অন্যদিকে গোপনে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে। এদিকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা বহনকারী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ট্রিপোলি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে, যা সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানে তাদের চিহ্নিত ‘শীর্ষ অগ্রাধিকার’ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে তারা আর মাত্র কয়েকদিন দূরে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট।
ইরানের রাজধানী তেহরানে ভারী বোমাবর্ষণের মধ্যে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। পাল্টা হুমকি হিসেবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এদিকে জেরুজালেমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্কেট জানিয়েছে, পাম সানডে উপলক্ষে গির্জার নেতারা প্রার্থনায় অংশ নিতে গেলে ইসরায়েলি পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একই সময়ে পোপ লিও যুদ্ধের পক্ষে ধর্মকে ব্যবহার করার চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইসরায়েল-লেবানন সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতির অস্থিরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে সাইরেন বাজতে শুরু করলে এক গণমাধ্যম দলের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের মাঝপথে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়। সীমান্তজুড়ে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বাড়ার ফলে লেবাননের অনেক বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নিরাপত্তা বাফার জোন সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, যাতে সীমান্ত পারাপার হামলা ঠেকানো যায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে এবং ওই এলাকা থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরে যেতে বলেছে। পাশাপাশি নদীর ওপর কয়েকটি সেতু ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ছাড়া অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বৈঠক শেষে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলে একটি শিল্প এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। একটি অস্ত্রের অংশ বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভগ্নাংশ আঘাত হানার পর এ আগুন লাগে বলে জানানো হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক ঘণ্টা ধরে কাজ করে ৩৪টি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইরানের হামলায় তাদের দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। একই সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একটি ব্যক্তিগত বার্তা ইরাকের একটি প্রধান শিয়া রাজনৈতিক দলের নেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম, যদিও বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের হুমকির প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বৈরুতে অবস্থিত আমেরিকান ইউনিভার্সিটি সাময়িকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণা দিয়েছে। একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটিসহ আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কাতারসহ অনেক দেশে শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ‘নো কিংস’ শিরোনামে দেশজুড়ে তৃতীয় দফার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট শহর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মানুষ সমবেত হয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কে বড় বড় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিনেসোটায় আয়োজিত একটি বড় সমাবেশে সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন পরিবেশনা করেন এবং বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বক্তা বক্তব্য দেন। গত বছরও এই আন্দোলনের দুই দফায় লাখো মানুষ অংশ নিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে। একদিকে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সূত্রঃ সিএনএন