যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩১ মার্চ- ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে “একভাবে বা অন্যভাবে” হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে।
সোমবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। একই সময়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সেনা মোতায়েন নিয়ে জল্পনা বাড়ছে এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
রুবিও বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রেখেছে এবং এখনো কিছু বার্তা আদান-প্রদান ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলছে। যদিও ইরান বরাবরই এমন আলোচনা অস্বীকার করে আসছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা শিগগিরই উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময় কূটনৈতিক সমাধানকেই প্রাধান্য দেন, তবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হয়েছে।
ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন রুবিও। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানে এমন নেতৃত্ব আসুক যারা ভিন্নভাবে ভবিষ্যৎ ভাববে। বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে তিনি সমস্যার মূল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশটির সম্পদ উন্নয়নে ব্যয় না করে হিজবুল্লাহ, হামাসসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তায় ব্যবহার করা হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। রুবিওর অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মাধ্যমে বিশ্বকে ভয় দেখাতে চায়। তবে তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। রুবিও বলেন, ভবিষ্যতে ইরান পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে, তবে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে দ্রুত তা অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব হয়।
এদিকে মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সংরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে নিতে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এমন পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব, তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের উদ্দেশে রুবিও বলেন, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা প্রয়োজন। তার মতে, ইরান বর্তমানে আগের চেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠলে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং ইরান একে বন্ধ রাখতে পারে না। যদি ইরান আন্তর্জাতিক আইন মেনে প্রণালী খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোট তা নিশ্চিত করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ শেষে যদি ইরান প্রণালী বন্ধ রাখার চেষ্টা করে, তাহলে এর জন্য “গুরুতর পরিণতি” ভোগ করতে হবে।
এদিকে ইউরোপ ও অন্যান্য মিত্রদেশগুলোর কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সরাসরি সহযোগিতা না করায়ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন রুবিও।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ করা। তবে ইরান এসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব কিছু দাবি জানিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তাদের অধিকার স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে আগ্রাসন বন্ধের নিশ্চয়তা।
চলমান এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন, উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ২৬ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছেন।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলো স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তা অর্জন করা হবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো ধ্বংসের কাজও দ্রুত সম্পন্ন করা হবে এবং এটি দীর্ঘ সময়ের বিষয় নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব হবে।