ঢাকায় চালু হচ্ছে পরীক্ষামূলক ‘ফুয়েল পাস’
মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- জ্বালানির চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে এই পাস…
মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি বাজার, কৃষি খাত এবং শিল্পকারখানায় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। যদিও সরকার পরিস্থিতিকে ‘স্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করছে, তবে অর্থনীতির উচ্চপর্যায়ে ইতোমধ্যেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে দেশটি হয়তো নীরবে মন্দার মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
অর্থনীতির প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, টানা ছয় মাস মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি কমে গেলে সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দা বলা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার অনেক আগেই বাস্তব অর্থনীতিতে মন্দার প্রভাব পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজেরাই পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক ধরে নিয়ে ব্যয় কমানো এবং কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে সংকুচিত করে।
ইতোমধ্যে এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় অনেক গাড়িচালক প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন ও বিনিয়োগে সতর্ক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক আস্থা নেমে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে, যা ভোক্তা ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার জনগণকে স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। সরকারের এই অবস্থানকে ঝুঁকি অস্বীকার নয়, বরং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সংকটের সময়ে আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যেই সরকার জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে নানা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে দেশের প্রয়োজনীয় স্থানে জ্বালানি পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন পর্যন্ত দেশজুড়ে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট না হয় এবং জাহাজের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত থাকে, ততদিন পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যয় কমানোর পথে হাঁটবে, যা অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। ছবিঃ সংগৃহীত
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসা ও পরিবারগুলোর কাছে ঝুঁকি নিজেই এক ধরনের খরচ। ভবিষ্যতে জ্বালানির ঘাটতি বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থাকলে আগেভাগেই কম উৎপাদন করা বা কম খরচ করা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো যৌক্তিক হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য তা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় এবং এভাবেই ধীরে ধীরে মন্দার সূচনা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শিল্প সংগঠন ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে তাদের খাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, অনিশ্চয়তার কারণে তারা আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে ভোক্তা আস্থা জরিপেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের হতাশা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
২০২০ সালের মহামারিকালীন মন্দার সময়ও একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল। তখন ভাইরাসের সরাসরি প্রভাবের চেয়ে মানুষের আচরণই অর্থনীতিকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। মানুষ নিজে থেকেই ঘরে থাকা শুরু করে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদি এই প্রবণতা আরও বাড়ে, তাহলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, মানুষের আয় হ্রাস পেতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে আস্থা ধরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় ব্যাংকিং খাতে সহায়তা এবং জনগণকে সরাসরি অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। আবার মহামারির সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল, যাতে তারা কর্মীদের ধরে রাখতে পারে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ছবিঃ সংগৃহীত
বর্তমান পরিস্থিতিতেও সরকারকে একই ধরনের দ্বিস্তরীয় আস্থা নিশ্চিত করতে হতে পারে। প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে—এই বিশ্বাস তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে আর্থিকভাবে সহায়তা করবে—এই নিশ্চয়তা দেওয়া।
যদিও এই ধরনের প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা অনেক সময় মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে এবং সমালোচনার মুখে পড়ে, তবুও অর্থনীতিবিদদের মতে সংকটের সময়ে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এতে মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে সাময়িকভাবে ব্যয় কমালেও পুরোপুরি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে পরিস্থিতি সাময়িক এবং সরকার পাশে থাকবে, তাহলে তারা স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ না করে সাময়িকভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এতে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কম হবে।
অন্যদিকে, যদি এই আস্থা তৈরি না হয়, তাহলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ীভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, কর্মীদের ছাঁটাই করতে পারে এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মন্দা ঠেকাতে বড় ধরনের সরকারি ব্যয় বা বাজেট ঘাটতি তৈরি হলেও অনেক সময় সেটিই কম ক্ষতিকর বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে বড় সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলো যেমন এই পথ বেছে নিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অস্ট্রেলিয়ার সরকারকেও তেমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au