নতুন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে কমেছে জাহাজ চলাচল
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও…
মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র আলোচনা তৈরি করেছে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা একটি অধ্যাদেশকে ভিত্তি করে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে এই বিল পাস করেছে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে ‘নিষিদ্ধ ঘোষণা’ এবং তাদের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করার আইনি সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হলে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। পরদিনই সেই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। তখন এই পদক্ষেপকে অনেকে ‘ব্যতিক্রমী’ ও ‘কঠোর’ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু এখন সেই একই বিধান সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় বিষয়টি আরও গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে।
বিলটিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে সেই সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। শুধু সংগঠন নিষিদ্ধ করাই নয়, তাদের পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, বিবৃতি প্রকাশ, গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম, মিছিল, সভা-সমাবেশ বা জনসমক্ষে বক্তব্য প্রদানও নিষিদ্ধ করা যাবে। অর্থাৎ এই আইন কেবল সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই সংগঠনের রাজনৈতিক উপস্থিতি ও জনসম্পৃক্ততার সব পথ বন্ধ করার একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি নতুন কোনো সংযোজন নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশকেই নিয়ম অনুযায়ী সংসদে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, সংসদে পাসের মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত এখন রাজনৈতিকভাবে বৈধতা পেল এবং এর দায় বর্তমান সরকারের ওপরই বর্তাবে।

এই বিল পাসের ফলে আওয়ামী লীগের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করায় তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ আবার স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে পারবে—এমন প্রত্যাশা দলটির সমর্থকদের মধ্যে ছিল। কিন্তু নতুন আইন সেই সম্ভাবনাকে আপাতত বন্ধ করে দিল।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক—কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এটি বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ?
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি জনমতের প্রতিফলন এবং আওয়ামী লীগকে এখনই স্বাভাবিক রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হলে তা ‘স্বৈরাচারকে বৈধতা দেওয়ার’ শামিল হবে। তার মতে, দেশের মানুষের মধ্যে এখনো দলটির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে এবং সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নজির হিসেবে দেখছেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, কোনো দলের সদস্যরা অপরাধ করলে তাদের বিচার হওয়া উচিত, কিন্তু পুরো দল বা তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলে সেটি ভবিষ্যতে অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগের পথ খুলে দেয়। অর্থাৎ এটি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তার মতে, যদি কোনো দলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই দলের রাজনীতির অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তিনি মনে করেন, এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সিদ্ধান্তকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যাবে না। তবে তিনি এটিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও থাকতে পারে।
রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ মাঠে সক্রিয় না থাকায় একটি শক্তিশালী বিরোধী শক্তির অভাব তৈরি হয়েছে, যা শাসক দলের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আবার সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের ভোটের হিসাবও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে এলে সেই নির্বাচনী সমীকরণ জটিল হয়ে উঠতে পারত।
এছাড়া আওয়ামী লীগবিরোধী জনমত এখনো তীব্র—এই ধারণাও সরকারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সুযোগ দিলে তা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং অন্যান্য দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের প্রতিক্রিয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনাও রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি নীরব বোঝাপড়া থাকতে পারে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে এবং সেই কারণে আপাতত আওয়ামী লীগকে রাজনীতির বাইরে রাখার বিষয়ে একমত হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য নেই, তবুও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিশ্লেষণ আলোচনায় রয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au