পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করল বিজেপি। ছবিঃ আনন্দবাজার
মেলবোর্ন, ১০ এপ্রিল- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটের আগে আবারও রাজ্য সফরে গেলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর আগে তিনি রাজ্যে এসে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘অপশাসনের চার্জশিট’ প্রকাশ করেছিলেন এবং ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার রোড শোতেও অংশ নিয়েছিলেন। এবার তিনি দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করলেন।
শুক্রবার নিউ টাউনের একটি হোটেলে বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার, যাকে দলটি ‘সঙ্কল্পপত্র’ নামে অভিহিত করছে, তা প্রকাশ করেন অমিত শাহ। এরপর তার প্রচারণার অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি ডেবরা এবং খড়গপুরে সভা করবেন। শনিবার পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় তার আরও কয়েকটি জনসভা এবং সাংগঠনিক বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ইশতেহার প্রকাশের সময় অমিত শাহ বলেন, এই সঙ্কল্পপত্র পশ্চিমবঙ্গের নারী ও যুবসমাজের মধ্যে আস্থা তৈরি করবে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উন্নত ভারতের রোডম্যাপ রাজ্যের মানুষের সামনে তুলে ধরবে।
তিনি আরও বলেন, বাঙালি নববর্ষের দিনে এই সঙ্কল্প নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করা হয়েছে। তার দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে রাজ্যে যে অস্থিরতা ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মানুষ মুক্তি চাইছে।
অমিত শাহ অভিযোগ করেন, বর্তমান শাসনামলে রাজ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, বিজেপির লক্ষ্য হলো ‘সোনার বাংলা’ গড়া এবং আগামী পাঁচ বছরে রাজ্যের উন্নয়নকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়া। তার মতে, জনগণ বিজেপিকে সুযোগ দিলে রাজ্যের পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
এছাড়াও, বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই কাউকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অমিত শাহ।
কী আছে বিজেপির পরিকল্পনায়-

অমিত শাহ’র সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত
অনুপ্রবেশ ও গরু পাচারে ‘জ়িরো টলারেন্স’
শাহ বলেন, ‘অনুপ্রবেশে ‘জ়িরো টলারেন্স’। আমরা ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট নীতির মাধ্যমে বেছে বেছে অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্য থেকে বার করব। দেশকে সুরক্ষিত করব।’
পাশাপাশি, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সীমানা সুরক্ষিত করার পাশাপাশি গরু পাচার একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানান অমিত শাহ।
ডিএ আশ্বাস
সকল সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের ডিএ সুনিশ্চিত করা হবে। ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন চালু করা হবে।
এক আইন!
বাংলায় সকল নাগরিকের জন্য এক আইন নিশ্চিত করা হবে।
বেকারদের ভাতা
নতুন রোজগারের পথ খুলবে বিজেপি। তাতে বেকারত্ব ঘুচবে। বেকারদের মাসে তিন হাজার টাকা করে অর্থসাহায্য করা হবে।
রাজনৈতিক সহিংসতার তদন্ত
সকল রাজনৈতিক সহিংসতার তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের দিয়ে কমিটি গড়ে দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে।
আর কী কী আছে?
মহিলাদের সুরক্ষায় বিশেষ স্কোয়াড গঠন করা হবে। আলু চাষিদের জন্যেও বিশেষ ব্যবস্থা করার আশ্বাস রয়েছে বিজেপির ইশতেহারে।
উত্তরবঙ্গে এমস, আইআইটি, আইআইএম এবং ফ্যাশন ডিজ়াইনিংয়ের প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে আলাদা আলাদা জেলায়। রাজ্যে বন্দেমাতরম মিউজিয়াম গঠন করার কথাও জানালেন অমিত শাহ।
যে সব জমির কাজ আটকে আছে, ৪৫ দিনের মধ্যেই ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তা ছেড়ে দেবে। মাফিয়ারাজের মোকাবিলার রোড ম্যাপ সরকারে এলে প্রথম ছ’দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। সুনির্দিষ্ট ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় যোগ্যদের মেধার ভিত্তিতে স্থায়ী চাকরি নিশ্চিত করা হবে।
পাশাপাশি ইশতেহারে কলকাতার জন্য বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করলেন শাহ। ১০ বছর ধরে শহরের অগ্রগতির পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির।
রাজ্যের সব চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হবে। সব মণ্ডলে মহিলা থানা থাকবে। প্রতি পুলিশ জেলায় মহিলা ডেস্ক থাকবে। দিনরাত সেখানে কাজ হবে।
শাহ বলেন, ‘‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে কখনও এমন কথা বলতে হবে না যে, মহিলারা কেন রাতে বাইরে বেরিয়েছেন।’’ মহিলাদের জন্য ১০০ শতাংশ বিনা শুল্ক পরিবহণ নিশ্চিত করবে বিজেপি সরকার। সন্দেশখালির মতো ঘটনা আটকাতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণে তদন্ত হবে। তাজপুর, কুলপিতে বিশেষ ডিপ সি পোর্ট তৈরির পরিকল্পনা। চা এবং পাট শিল্পেও জোর দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গকে ব্লু ইকনমির প্রধান রফতানি ক্ষেত্র বানানো হবে বলে জানান শাহ। রাজ্যে চারটি নতুন উপনগরী তৈরি করা হবে। জায়গা বেছে করা হবে। আগামীর সম্ভাবনাকে আরও বিকশিত করাই লক্ষ্য। হলদিয়া বন্দরের বিকাশের জন্য আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। যুবদের ১৫ হাজার টাকা
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যুবদের ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া, যাঁরা দুর্নীতির জন্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সে ছাড় দেওয়া হবে।
ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়
উত্তরবঙ্গে একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হবে। কৃষকদের ধানের মূল্য নির্দিষ্ট করা হবে।
স্বাস্থ্য নিয়ে
আয়ুষ্মান ভারতের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর যোজনাও যোগ করা হবে। প্রত্যেক গরিব মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। উত্তরবঙ্গে নতুন ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি হবে যেখানে সব সুবিধা থাকবে।
কৃষকদের জন্য
প্রধানমন্ত্রী কিসান প্রকল্পের টাকা বাড়ানো হবে। কেন্দ্রের ৬০০০ টাকার সঙ্গে রাজ্য সরকারের ৩০০০ টাকা যোগ করে মোট ৯০০০ টাকা করে দেওয়া হবে।
সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি
চৈতন্য মহাপ্রভু আধ্যাত্মিক সার্কিটের উন্নয়ন হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করা হবে। থিয়েটারের জন্য আধুনিক ইনস্টিটিউট তৈরি করা হবে। থিয়েটারের বার্ষিক অনুদান বাড়িয়ে এক লক্ষ করা হবে।
বঙ্গভঙ্গ নয়
বাংলাকে একসঙ্গে রেখে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন করা হবে।
হেরিটেজ দার্জিলিং
দার্জিলিংকে হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে বিবেচনা করা হবে। পর্যটন শিল্পে জোর দেওয়া হবে। কলকাতাকে সারা বিশ্বের সামনে ‘লিভিং সিটি’ হিসাবে প্রকাশ করা হবে। শাহ বলেন, ‘‘ভয়রহিত বাংলা গড়া আর ভরসাযুক্ত বাংলা গড়া— আমাদের সঙ্কল্পপত্রের মূল ভাব এটাই। গত প্রায় পাঁচ দশক বাংলাকে শুধু নীচে নামানো হয়েছে। আমরা বাংলায় আবার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ আনব। দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য বানাব। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অনুপ্রবেশ মুক্তি, শিল্পোন্নয়ন, কৃষকের উন্নয়নে জোর দেবে নতুন সরকার।’’
সূত্রঃ আনন্দবাজার